
মানুষ কেন্দ্রিক জলবায়ূ বিষয়ক পদক্ষেপের এক নতুন অধ্যায়-নিকোলাস বিশ্বাস
প্রেসবিজ্ঞপ্তিঃ
জাতিসংঘের জলবায়ূ বিষয়ক ৩০তম সম্মেলন বৈশ্বিক জলবায়ূ কূটনীতিতে একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে-যা ২০২৫ সালের ১০-২১ নভেম্বর ব্রাজিলের বেলেমে অনুষ্ঠিত হয়।
অ্যামাজন রেইনফরেস্টের প্রান্তে-যা বিশ্বের বৃহত্তম বনভূমি এবং বৈশ্বিক জলবায়ূর একটি প্রধান নিয়ন্ত্রক-এই সম্মেলন জলবায়ূ বিষয়ক পদক্ষেপের জরুরী প্রয়োজন ও রূপান্তরমূলক সমাধানের বিপুল সম্ভাবনাকে সামনে এনেছে।
ব্রাজিলের বৈশ্বিক মুতিরাঁও” (সমষ্টিক প্রচেষ্টা) ধারণা দ্বারা পরিচালিত জলবায়ূ সম্মেলন জোর দিয়ে এ বিষয়টি উল্লেখ করেছে: কার্যকর জলবায়ূ পদক্ষেপ হতে হবে।
বাস্তবসম্মত, অন্তর্ভূক্তিমূলক এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবন উন্নত করার সাথে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত।
এবারের জলবায়ূ সম্মেলন মোট ছয়টি কৌশলগত স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে আয়োজন করা হয়েছে; যা হল: ১) জ্বালানি রূপান্তর, ২) জলবায়ূ অর্থায়ন, ৩) অভিযোজন ও স্থিতিস্থাপকতা, ৪) বন ও জীববৈচিত্র্য, ৫) কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থা এবং ৬) অন্তর্ভূক্তিমূলক প্রশাসন ও প্রযুক্তি।
এই সম্মেলনের অন্যতম লক্ষ্যগুলো ছিল প্রতিশ’æতি থেকে বাস্তবায়নে অগ্রসর
হওয়া এবং এমন ভবিষ্যৎ গঠন করা যেখানে মানুষ জলবায়ুর প্রভাবের মধ্যে শুধু টিকেই থাকবে না-বরং উন্নতিও করবে এবং সাফল্যমÐিত হবে। নি¤েœ উল্লেখিত ছয়টি কৌশলগত স্তম্ভের ওপর আলোকপাত করা হল: ১. জ্বালানি রূপান্তর: পরিষ্কার, সাশ্রয়ী শক্তির বিস্তার
৩০তম জলবায়ূ সম্মেলনের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল বৈশ্বিক জ্বালানি রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করা। বিশ্ব এখনো ব্যাপকভাবে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল বিধায় দেশগুলো দায়িত্বশীল ও ন্যায়সঙ্গত উপায়ে তা পর্যায়ক্রমে বন্ধ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। ১.৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা সীমায় রাখতে হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণ, জ্বালানি সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রাকৃতিক জ্বালানী শক্তির উপর বিনিয়োগ বাড়ানো এবং আগ্রহী হওয়ার
জন্য বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানী কার্বন-ডাই-অক্সাইড তৈরীতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
এবারের সম্মেলনের মূল লক্ষ্য ছিল ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা তিনগুণ বৃদ্ধি এবং বার্ষিক জ্বালানি সক্ষমতা দ্বিগুণ করা। ব্রাজিল বাস্তবে দেখিয়েছে কীভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং প্রাকৃতিক জ্বালানী শক্তি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং জনস্বাস্থ্য বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
আলোচনার মূল বার্তা ছিল: জ্বালানী শক্তির সফল রূপান্তর হতে হলে প্রাকৃতিক জ্বালানী-শক্তি সবার জন্য সহজপ্রাপ্য ও সাশ্রয়ী হতে হবে।
২. জলবায়ূ অর্থায়ন: পরিকল্পনাকে বাস্তবতায় রূপ দেওয়া জলবায়ূ অর্থায়ন সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত ইস্যূ হিসেবে উঠে আসে। উন্নয়নশীল দেশগুলো জোর দিয়ে জানায় যে, যথেষ্ট বিনিয়োগ ছাড়া, বিশেষতঃ অভিযোজন তহবিল বৃদ্ধি ছাড়া, কোনও জলবায়ূ পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ পাবে না। অভিযোজন অর্থায়ন তিনগুণ বৃদ্ধি করার দাবিও আলোচনায় ছিল।
আলোচনা হয়েছে কীভাবে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনাগুলোকে কার্যকর প’কল্পে রূপান্তর করা যায়। এর মধ্যে ছিল-বন্ডেড ফাইন্যান্স, সহজতর অনুদান প্রক্রিয়া এবং বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংকসমূহের অধিকতর সম্পৃক্ততা।
আলোচনার মূল বার্তা ছিল: দীর্ঘমেয়াদী, নির্ভরযোগ্য ও সহজলভ্য অর্থায়ন ছাড়া জলবায়ূ প্রতিশ্রুতির কোনো বাস্তব মূল্য নেই।
৩. অভিযোজন ও স্থিতিস্থাপকতা: বেলেম হেলথ অ্যাকশন প্ল্যানের সূচনা এবার সম্মেলনে অভিযোজন বিষয়টি অভাবনীয়ভাবে গুরুত্ব পায়-বিশ্বজুড়ে জলবায়ূর প্রভাব মোকাবিলা করার প্রতি শক্তিশালী ব্যবস্থা গড়ার প্রয়োজনীয়তা স্বীকৃতি পায়। এ সম্মেলনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অর্জন ছিল বেলেমে ‘‘হেলথ অ্যাকশন প্ল্যান” গৃহীত হওয়া। এই বৈশ্বিক প্রতিশ্রæতির লক্ষ্য হল জলবায়ূ-স্থিতিস্থাপক স্বাস্থ্যব্যবস্থা তৈরি করা। কারণ তীব্র তাপদাহ, নতুন রোগের বিস্তার, বায়ূদূষণ এবং জলবায়ূ সম্পর্কিত দুর্যোগ জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
‘‘হেলথ অ্যাকশন প্ল্যান”-এর অতর্ভূক্ত বিষয়গুলো হল:-আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা; -জলবায়ূসহনশীল স্বাস্থ্য অবকাঠামো তৈরী;-কমিউনিটিভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা চালুকরণ; এবং -জলবায়ূ জরুরি অবস্থার জন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রস্তুত করা।
এছাড়াও স্থিতিস্থাপক অবকাঠামো, কৃষিতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, উন্নত পানি ব্যবস্থা এবং টেকসই নগর উন্নয়ন নিয়ে সম্মেলনে বিশেষ আলোচনা হয়েছে।
৪. বন ও জীববৈচিত্র্য: বৈশ্বিক কর্মযজ্ঞের কেন্দ্রে অ্যামাজন “অ্যামাজন সম্মেলন” হিসেবে পরিচিত জাতিসংঘের এই ৩০তম জলবায়ূ সম্মেলনে বন ও জীববৈচিত্র্য ছিল আলোচনার
কেন্দ্রবিন্দু। অ্যামাজনের মতো ক্রান্তীয় বনভূমি শুধু কার্বন শোষকই নয়; এটি বৈশ্বিক জলচক্র, বৃষ্টি এবং অসাধারণ জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে। বন ধ্বংস না করার প্রতিশ্রæতি বাস্তবায়ন করার জন্য এই বিষয়গুলোর উপর সম্মেলনে বিশেষ আহবান জানানো হয়:-কঠোর আইন প্রয়োগ; -আদিবাসীদের ভূমির অধিকার শক্তিশালী করা; এবং-বন সংরক্ষণে
তহবিল বৃদ্ধিকরণ। এখানে জীববৈচিত্র্য রক্ষা জলবায়ূ পদক্ষেপের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে উল্লেখ করা হয়। সুস্থ পরিবেশই বেশি কার্বন শোষণ করে এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষা করে।
৫. কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থা: কৃষকদের সুরক্ষা, উষ্ণায়ন এবং পৃথিবীতে খাদ্য নিরাপত্তা
কৃষি হল জলবায়ূ পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ খাতগুলোর একটি। অনিয়মিত বৃষ্টি, খরা, তীব্র তাপ এবং মাটির অবক্ষয় কৃষকদের জীবিকা ও খাদ্য নিরাপত্তা বিপন্ন করছে। জলবায়ূ সম্মেলনে কৃষকদের জন্য এই সমাধানগুলো তুলে ধরা হয়: -জলবায়ূ সহনশীল বীজ ও প্রযুক্তি; -সাশ্রয়ী ফসল বীমা;-জলবায়ূসহনশীল সেচ ব্যবস্থা; এবং-টেকসই কৃষি প্রশিক্ষণ।
এছাড়াও সম্মেলনে রূপান্তরযোগ্য কৃষি, সামাজিক বনায়ন এবং স্বল্পনিঃসরণযোগ্য উৎপাদন পদ্ধতিকে উৎসাহিত করা হয় এবং এ ব্যাপারে কৃষকদের প’য়োজনীয় প’শিক্ষণের উপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
৬. অন্তর্ভূক্তিমূলক প্রশাসন ও প্রযুক্তি: মানুষের ক্ষমতায়ন ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি সম্মেলনে ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতির দপ্তর থেকে জোর দিয়ে বলা হয় যে, সম্মিলিতভাবে জলবায়ূ পরিবর্তনজনিত সমস্যা
সমাধান করা সম্ভব। এখানে অসম্ভব বলে কিছু নেই। সরকার, সিভিল সোসাইটি, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, যুবসমাজ এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত অংশগ্রহণ ছিল জাতিসংঘের এই ৩০তম জলবায়ূ বিষয়ক সম্মেলনের অন্যতম শক্তি।
প্রযুক্তিকেও জলবায়ূ কার্যক্রমের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে দেখা হয়। সম্মেলনে ব্রাজিল উল্লেখ করে যে, তারা সম্প্রতি এই দুটি প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে:-গ্রিন ডিজিটাল অ্যাকশন হাব; এবং -এআই ক্লাইমেট ইনস্টিটিউট।
এর উদ্দেশ্য হল: ডেটা স্বচ্ছতা, ডিজিটাল উদ্ভাবন, নিঃসরণ ট্র্যাকিং এবং জলবায়ূ বিষয়ক পূর্বাভাস উন্নত করা।
মানুষকেন্দ্রিক উন্নত ভবিষ্যতের দৃষ্টিভঙ্গি: সব স্তম্ভ জুড়েই জাতিসংঘের ৩০তম জলবায়ূ সম্মেলন এই বার্তা দেয় যে, জলবায়ূপদক্ষেপের মাধ্যমে মানুষের জীবনমান উন্নত করতে হবে: নির্মল বাতাস, স্বাস্থ্যকর সমাজ, নিরাপদ বাসস্থান, স্থিতিশীল খাদ্য ব্যবস্থা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। বৈশ্বিক মুতিরাঁও”-এর চেতনাই এই লক্ষ্যকে ধারণ করে-সমষ্টিগত প্রচেষ্টাই টেকসই জলবায়ূ সংক্রান্ত অগ্রগতির পথ। ব্যবহারিক সমাধান, অন্তর্ভূক্তিমূলক প্রশাসন এবং
বাস্তবায়ন ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে ৩০তম জলবায়ূ সম্মেলন বিশ্বকে দেখিয়েছে যে, জলবায়ূউচ্চাকাঙ্ক্ষা তখনই সফল হয় যখন তা মানুষের জীবন, ন্যায়বিচার এবং সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত থাকে।
নিকোলাস বিশ্বাস একজন ডেভেলপমেন্ট প্র্যাকটিশনার এবং “জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল মিডিয়া” অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্ত।