দশ বছরের হাসানের কাঁধে পরিবারের হাল

অর্থনীতি কুষ্টিয়া খুলনা জাতীয় সারাদেশ
শেয়ার করুন....,

দশ বছরের হাসানের কাঁধে পরিবারের হাল

হৃদয় রায়হান, কুষ্টিয়াঃ

যে বয়সে শিশুদের বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা, সে বয়সে হাসানের হাতে এখন ভ্যানের হ্যান্ডেল। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে, ক্ষুধা ও ক্লান্তি সহ্য করে প্রতিদিন রাস্তায় নেমে পড়ে এই শিশু।

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার আদাবাড়ীয়া ইউনিয়নের গরুড়া মিস্ত্রিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ৩৭ বছর বয়সে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে গত পবিত্র রোজার ঈদের দিন মৃত্যুবরণ করেন হাবিবুর রহমান (হাবু)। তার অকাল মৃত্যুতে তিনটি অবুঝ সন্তান হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ অসহায়।

তাদের মধ্যে বড় ছেলে জুনায়েদ হোসেন (১৩) মানসিকভাবে কিছুটা দুর্বল হওয়ায় স্বাভাবিক কাজ করতে পারে না। মেজ ছেলে হাসান আলী (১০), যে বয়সে তার স্কুলে যাওয়ার কথা, সেই বয়সেই পরিবারের হাল ধরতে বাধ্য হয়েছে। আর সবচেয়ে ছোট সদস্য ৫ বছরের কন্যা উম্মে হাবিবা এখনো বুঝে উঠতে পারেনি জীবনের কঠিন বাস্তবতা। পরিবারের সঙ্গে রয়েছেন বৃদ্ধ দাদা মোসলেম উদ্দিন (৬৫) ও দাদি শপাজান (৬০)।

হাবিবুর রহমানের অসুস্থতার সুযোগে চিকিৎসার জন্য সঞ্চয়কৃত প্রায় তিন লাখ টাকা ও ছোট মেয়ের একটি স্বর্ণের হার নিয়ে তার স্ত্রী অন্যত্র পালিয়ে যান ও বিয়ে করেন। এই অর্থ হাবিবুর রহমান ভারতে চিকিৎসার জন্য সঞ্চয় করেছিলেন। মায়ের এমন সিদ্ধান্ত তিনটি শিশুর জীবনে নামিয়ে আনে অন্ধকারের গভীর ছায়া।

মাকে হারানোর শোক কাটতে না কাটতেই, বাবার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এই পরিবারটি হারায় শেষ আশ্রয়টুকুও। বর্তমানে মাত্র ১০ বছরের হাসান আলী বাবার রেখে যাওয়া ভ্যান চালিয়ে পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করছে। সারাদিন পরিশ্রম করে সে কখনো ৪০-৫০ টাকা, আবার কোনো দিন সর্বোচ্চ ১০০ টাকা আয় করে, যা দিয়ে কোনো মতে চলে তিন ভাইবোন ও দাদা, দাদির জীবনযাপন।

এলাকার বাসিন্দারা বলেন, এত অল্প বয়সের একটি শিশুকে ভ্যান চালাতে দেখা আমাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর। যে বয়সে তার হাতে বই-খাতা থাকার কথা, স্কুলের আঙিনায় সহপাঠীদের সঙ্গে হাসি-আনন্দে সময় কাটানোর কথা, সে বয়সেই তাকে জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয়েছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি আশরাফুজ্জামান মুকুল সরকার বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক।

 

এত অল্প বয়সে একটি শিশুকে পরিবারের দায়িত্ব নিতে হচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমরা স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিবারটির খোঁজখবর নিচ্ছি এবং যথাসম্ভব সহায়তার চেষ্টা করছি। সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষদের এগিয়ে আসার জন্য আমি আন্তরিক আহ্বান জানাচ্ছি।

এ বিষয়ে দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার অনিন্দ্য গুহ জানান, শিশুগুলোর বাবা মারা গেছেন এবং মা অন্যত্র বিয়ে করেছন। বর্তমানে পরিবারে তিনটি ছোট শিশু ও বৃদ্ধ দাদা-দাদি রয়েছেন। এই অবস্থায় তাদের পক্ষে দৈনন্দিন খরচ বহন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিষয়টি আমরা অবগত আছি এবং আমরা তাদেরকে কিছু সহায়তা দিয়েছি।

তিনি বলেন, তাদের জন্য একটি স্থায়ী সমাধানের চেষ্টা করছি। এ বিষয়ে শিশুদের দাদা-দাদি ও চাচা-চাচিদের সঙ্গে আমরা আলোচনা করব। যদি তারা দীর্ঘমেয়াদে শিশুদের দেখাশোনা করতে অপারগ হন, তাহলে শিশুদের সরকারি শিশু পরিবারে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

 

অন্যদিকে, যদি পরিবারটি এই সিদ্ধান্তে রাজি না হয় এবং শিশুদের দাদা দায়িত্ব নিতে ইচ্ছুক ও সক্ষম হন, তাহলে তাকে সরকারি অনুদানের মাধ্যমে একটি ছোট দোকান স্থাপন করে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।


শেয়ার করুন....,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *