
লক্ষ্মীপুরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে মেডিকেল অফিসার পদায়ন থাকলেও নানা অজুহাতে অনুপস্থিত
তাবারক হোসেন আজাদ, লক্ষ্মীপুর:
লক্ষ্মীপুরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র গুলোতে পদায়ন থাকলেও সেখানে যান না চিকিৎসক।
মেডিকেল অফিসারের পদায়ন থাকলেও নানা অজুহাতে সেখানে যান না অনেকে।
মঙ্গলবার ঈদের পর খোলার দিনও (২৪ মার্চ) কর্মস্থলে উপস্থিত হননি তারা।
একইসঙ্গে ১৬৫ জনই শুণ্যপদ ও বেহাল অবস্থা এসব স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ভবনগুলোর। কয়েকটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র খুবই জরাজীর্ণ অবস্থা। মেডিকেল অফিসারগন যারাই আছেন, মাসে একবার কর্মস্থলে গেলেও সই দিয়ে শহরের প্রাইভেট হাসপাতালে প্রাকটিস করছে। চাহিদা অনুযায়ী সেবা পাচ্ছে না সেবা প্রত্যাশীরা।
এছাড়াও পরিবার কল্যাণকেন্দ্রের জন্য গত বছরগুলোতে বাজেট হওয়া আইপিএসসহ একাধিক জিনিষপত্র গোপনে বিক্রি অভিযোগ ওঠেছে ডাক্তারসহ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।
গত ১৫ বছর কোন নিয়োগ নেই বেশিরভাগ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে। যেখানে আছে সেখানেও যান না চিকিৎসকরা। স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে ভিজিট করেননা এবং চিকিৎসাও দিচ্ছেননা। ডাক্তার না থা ও তদারকি না করায় ডেলিভারি করার নামে সেবাগ্রহিতাদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এফডব্লিওরা।
কাগজে-কলমে বছরের পর বছর পদায়ন থাকলেও তাদের চেনেন না এলাকার মানুষ। এভাবেই চলছে লক্ষ্মীপুরে জেলার ৩৫টি-স্বাস্থ্য কেন্দ্র। এতে চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন না প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ। সেবা নিতে তাদের ছুটতে হয় গ্রাম থেকে জেলা সদর হাসপাতালে।
জেলায় অনুমোদিত পদ উপপরিচালক ও সহকারি পরিচালকসহ ৬১৮ জন। তার মধ্যে মেডিকেল অফিসার (সিসি)-১ জনে ১ জন, উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা-৫ জনে ৩ জন, মেডিকেল অফিসার (এমসিএইচ-এফপি) ও পরিবার কল্যাণ) দুইজন। সহকারি উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ৯ জনে ৮ জনই নাই।
উপ-সহকারি কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার ৩১ জন ২১ জনই নাই, ফার্মাসিষ্ট ১১ জনে-৮ জনই নাই, পরিবার কল্যান পরিদর্শিকা ৩০ জন, পরিবার কল্যাণ সহকারি ১২৯ জনসহ মোট ১৬৫টি শুণ্য।
লক্ষ্মীপুর সিভিল সার্জন অফিসের দেয়া তথ্য মতে, জেলার ৫টি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ৩৫ টি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র রয়েছে। সেগুলো হলো-.সদর উপজেলায় ১৭টি, রায়পুর উপজেলায় ৭টি, রামগন্জ উপজেলায় ২টি, কমলনগর উপজেলায় ২টি ও রামগতি উপজেলায় ৬টি ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র। এই কেন্দ্রগুলো ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে প্রতিদিন প্রায় ১৫শ থেকে ২ হাজার মানুষ চিকিৎসা সেবা নিতে আসেন।
স্বাস্থ্য বিভাগ আরো জানায়, এই উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ৬টি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসক পদায়ন ও ১টিতে পদ শূন্য রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে পদায়ন থাকলেও সেখানে যান না চিকিৎসক। সহকারী মেডিকেল অফিসারের পদায়ন থাকলেও নানা অজুহাতে সেখানে যান না অনেকে। একইসঙ্গে বেহাল অবস্থা এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভবনগুলোরও। সর্বশেষ ২০১৯ সালে কিছুটা মেরামতের কাজ করা হয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রেরই জরাজীর্ণ অবস্থা। সেখানেই সেবা দিচ্ছেন কর্মকর্তারা। চাহিদা অনুযায়ী সেবাপাচ্ছেনা সেবাপ্রত্যাশীরা।
রায়পুরের চরপাতা উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে পরিবার কল্যান পরিদর্শিকা চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন। সেখানে দেখা মেলেনি কোন মেডিকেল অফিসারেরও। ঠাণ্ডা জ্বরের ওষুধ দেয়াসহ সবকাজ করছেন পরিদর্শিকা। অনেক রোগীকে দেখা গেছে চিকিৎসা না নিয়েই ফেরত যেতে। একই অবস্থা বিরাজ করছে কেরোয়া, বামনী, চরমোহনা, চরবংশী ও চরআবাবিল ইউপির উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে।
একইভাবে বিরাজ করছে সদরের উত্তর হামছাদী, উত্তর জয়পুর, চন্দ্রগন্জ, কমলনগরের চরফলকন ও রামগন্জের দরবেশপুর ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে। গিয়ে দেখা যায়, সেখানেও কোনো মেডিকেল অফিসার নেই। নামমাত্র চলছে চিকিৎসা সেবা।
এদিকে চিকিৎসকসহ জনবল পদায়ন না হওয়ায় প্রায় এক বছর বেশি সময় আগে বন্ধ হয়ে গেছে রায়পুরের সোনাপুরসহ কয়েকটি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র। খুলে পড়ছে ইট ও পলেস্তারা। চুরি হয়ে গেছে জানালা-দরজা। পরিণত হয়েছে জোপঝাড়ে। অথচ সরকারি খাতায় এখনো চালু এই উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি।
রায়পুরের চরপাতা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে সেবা নিতে আসা পারুল বেগম নামের এক রোগীর স্বজন বলেন, আমরা এর আগে এখানে একজন বড় ডাক্তার দেখেছি। তিনি মাঝে মাঝে এসে আমাদের সেবা দিতেন। অনেক বছর হয়ে গেল তিনি চলে গেছেন। এরপর আর কাউকে তো দেখি না।
মাহফুজা বেগম নামের এক রোগী বলেন, উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে আসলে শুধু চেকআপের পর কিছু বড়ি ছাড়া আর কোন ওষুধ দেয়া হয়না। এত বড় হাসপাতাল করছে সরকার। শুনেছি নাকি এখানে বড় ডাক্তারের নিয়োগও আছে কিন্তু তাকে তো পাই না। আমরা চাই, এখানে একজন মেডিকেল অফিসার নিয়োগ দেয়া হোক, যিনি নিয়মিত আমাদের সেবা দেবেন।
রায়পুর পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ডাঃ আবদুল্লাহ আল নোমান (শিশু ডাক্তার) ও রামগন্জে ডাক্তার এএম সালমান রহমান ও সদরের ডাঃ জুনাইদ আহমেদ মারুফ বলেন, আমরা সঠিকভাবেই দায়িত্ব পালন করছি। পুরো জেলার চিত্র এটি। ঈদের পরপরই প্রতিটিকেন্দ্র ভিজিট করা হবে।
লক্ষ্মীপুর জেলা পরিবার পরিকল্পনা কল্পনা কর্মকর্তা ডা. হাসান মাহমুদ বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, এই জেলায় চিকিৎসক ও কর্মকর্তা খুবই সংকট রয়েছে। মেডিকেল অফিসারদের কে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো পরিদর্শন ও ওখানেই চিকিৎসেবা দিতে বলা হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে আমরা উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করেছি। তারাও আমাকে আশ্বাস দিয়েছেন জেলায় চিকিৎসক নিয়োগ দেয়া হবে। আশা করি, নিয়োগ দেয়া হলে এ সমস্যার সমাধান হবে।