রায়পুরে অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটে অসহায় রোগীর স্বজনরা-প্রশাসনের সতর্কজারি

অর্থনীতি কুমিল্লা চট্টগ্রাম জাতীয় রাজনীতি সারাদেশ
শেয়ার করুন....,

রায়পুরে অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটে অসহায় রোগীর স্বজনরা-প্রশাসনের সতর্কজারি

তাবারক হোসেন আজাদ, লক্ষ্মীপুর:

রোগীকে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর ৫০ শয্যা সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করেন মো. তারেক। কিন্তু চিকিৎসক ঢাকায় রেফার্ড করেন। রায়পুর সরকারি হাসপাতাল থেকে ঢাকায় সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে (স্বপ্নযাত্রা) করে রুগীকে নিয়ে যাওয়ার জন্য কথা বললে তারা বাধা দেয়।

রায়পুর হাসপাতালের বেসরকরি অ্যাম্বুলেন্স মালিক ও চালকরা ওই অ্যাম্বুলেন্সকে এখান থেকে রোগী নিয়ে যেতে দেবেন না বলে বাধা প্রদান করেন।

পরে বাধ্য হয়ে সাংবাদিক ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে ডেকে স্বপ্নযাত্রার এম্বুল্যান্স চালক তারেক তার পিতাকে ঢাকা নিয়ে যান। তারেকের অভিযোগ বেসরকারি এম্বুল্যান্স চালকরা সিন্ডিকেট তৈরি করে লক্ষ্মীপুর যেতে ১৫০০ টাকা করে নিচ্ছে। না হলে সরকারি এম্বুল্যান্স চালকদের বাধা দেয় ও মারধর করে।

অপরদিকে, গত ২৩ নভেম্বর রাত ৮টার সময় রায়পুরের রাখালিয়া গ্রামের আবু সুফিয়ানের পিতা স্টক করে মারা যান।

পরে বৃদ্ধের লাশ গ্রামে নেওয়ার জন্য সরকারি এম্বুল্যান্স স্বপ্নযাত্রায় করে নেওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করে বেসরকারি এম্বুল্যান্স চালক সমিতির সভাপতি মোঃ জুবলু ও সম্পাদক ফিরোজ আলম। এসময় বাধা দিলে লাঞ্চিত করে এবং হত্যার হুমকি দেয় নিহত বৃদ্ধের স্বজন রাকিবকে।

এ ঘটনায় রাকিব বুধবার (২৬ নভেম্বর) বিকালে ইউএনওকে অবহিত করে ওসির কাছে বিচার চেয়ে লিখিত অভিযোগ করেছেন।

রায়পুরে হরহামেশা সিন্ডিকেট করে রোগীর স্বজনদের থেকে এমন অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের মালিক ও চালকরা। শুধু তাই নয়, রোগীর স্বজনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে রায়পুর ৫০ শয্যা হাসপাতালের সামনে থাকা বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক ও চালকদের বিরুদ্ধে।

এছাড়াও ফিটনেসবিহীন, লাইসেন্সবিহীন অ্যাম্বুলেন্স ও অপ্রাপ্ত বয়ষ্ক চালকের কারণে মাঝে-মধ্যেই ঘটছে দুর্ঘটনা।

সরেজমিনে গিয়ে জানাযায়, রোগী পরিবহনের জন্য রায়পুর ৫০ শয্যা সরকারি হাসপাতালের সামনে ও তার আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকে ১০- ১৫টি বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স। যার বেশিরভাগই লাইসেন্সবিহীন। কয়েকটির চালক আবার অপ্রাপ্ত বয়ষ্ক। কিন্তু রোগীর স্বজনরা এসব তথ্য জেনে ও না জেনে ওইসব অ্যাম্বুলেন্সে করেই রোগীকে উন্নত চিকিৎসা জন্য জেলা ও ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক ও চালকরা সিন্ডিকেট করে রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে নিচ্ছেন অতিরিক্ত ভাড়া।

এছাড়াও ওই হাসপাতালের সামনের অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া অন্য কোনো উপজেলার অ্যাম্বুলেন্সে করে রোগী নিতেও প্রতিনিয়ত বাধা দেন মালিক ও চালকরা।

ভুক্তভোগী তারেক (স্বপ্নযাত্রা এম্বুল্যান্স চালক) অভিযোগ করে জানান, তার বাবা খুবই অসুস্থ্য হলে রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চিকিৎসক ঢাকায় রেফার্ড করেন। আমার অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার জন্য সরকারি হাসপাতালে আসি।

এসময় বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক ও চালকদের সঙ্গে কথা বললে তারা সিন্ডিকেট করে বাধা প্রদান করে।

তিনি বলেন, স্বপ্নযাত্রার অ্যাম্বুলেন্সগুলো এখানকার বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক ও চালকদের কাছে জিম্মি। আমার স্বপ্নযাত্রা অ্যাম্বুলেন্স ঢাকায় না আসার জন্য হুমকি দেন এবং পথরোধও করেন। আমি নিরুপায় হয়ে সাংবাদিক খবর দিয়ে আমার পিতাকে ঢাকায় নিয়ে আসি। এসময় সাংবাদিকদের দেখে পালিয়ে যান অপ্রাপ্ত বয়ষ্ক চালকরা।

এসময় একজন অ্যাম্বুলেন্সে রোগী নিয়ে আসলে কথা হলেও নাম-পরিচয় কিছু না বলে নিজেকে চালক হিসেবে অস্বীকার করেন তিনি।

অন্যদিকে আবদুল মন্নান জুবলু ও ফিরোজ আলমসহ একাধিক অ্যাম্বুলেন্স চালক জানান, তারা তেমন বেশি ভাড়া নিচ্ছেন না। রোগীর স্বজনরা ভাড়া বেশি মনে করতে পারে, তবে একটু বেশি ভাড়া না নিলে তাদের পোষায় না।

এছাড়াও তাদের কিছু চালক রয়েছে যারা রোগীর স্বজনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। তাই কিছু চালকদের কারণে তাদের বদনাম হচ্ছে বলেও দাবি করেন তারা।

রায়পুর অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সভাপতি মো. আবদুল মন্নান জুবলু সিন্ডিকেটের কথা অস্বীকার করলেও ফিটনেসবিহীন, লাইসেন্সবিহীন ও অপ্রাপ্ত বয়ষ্ক চালকের কথা স্বীকার করে বলেন, অন্য উপজেলায় আমাদের অ্যাম্বুলেন্স রোগী নিয়ে যায়, আসার সময় সেখানকার অ্যাম্বুলন্স মালিক ও চালকরা রোগী আনতে দেন না। আমরাও তাদের সদর হাসপাতাল থেকে রোগী নিতে দেই না। তবে রোগী নিয়ে তারা আসতে পারেন হাসপাতালে।

এছাড়া তারা সকল মালিকদের নির্দেশ দিয়েছেন ফিটনেসবিহীন অ্যাম্বুলেন্স না চালাতে। এমনকি সকল চালকের লাইসেন্স করাসহ অপ্রাপ্ত বয়ষ্ক চালকদের অ্যাম্বুলেন্স না চালাতেও বলেছেন বলে জানান তিনি।

তিনি আরও জানান, রায়পুরে সরকারি হাসপাতালে ৯টি সরকারি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা অর্ধ-শতাধিক। রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা বাহারুল আলম বলেন, সরকারি হাসপাতালে আসা সরকারি- বেসরকারি এম্বুল্যান্স চালকদের আচরনবিধি, জরিমানা ৩ হাজার টাকা ও ৭দিনের বহিস্কারাদেশ সহ ১১টি নির্দেশনা রয়েছে। তা চালকরা না মানলে আইনগত ব্যাবস্থা নেয়া হবে।

রায়পুর থানার ওসি নিজাম উদ্দিন ভুইয়া জানান, অ্যাম্বুলেন্সসহ সকল ফিটনেসবিহীন, লাইসেন্সবিহীন যানবাহন ও অপ্রাপ্ত বয়ষ্ক চালকের বিরুদ্ধে প্রতিদিনই আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

সিন্ডিকেট, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও রোগী এবং স্বজনদের হয়রানির লিখিত অভিযোগ দিলে আইগনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন তিনি।


শেয়ার করুন....,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *