
ব্রাহ্মণপাড়া-বুড়িচংয়ে শ্রমিক সংকটের হাহাকার-মাঠেই নষ্ট হচ্ছে কৃষকের সোনালি স্বপ্ন
সৌরভ মাহমুদ হারুন, বুড়িচংঃ
কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া ও বুড়িচং উপজেলায় এবার বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে।
মাঠজুড়ে দুলছে সোনালি ধান, বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে পাকা ধানের ম-ম সুবাস। কিন্তু প্রকৃতির এই প্রাচুর্যের মাঝেও কৃষকের ঘরে নেই স্বস্তি, মুখে নেই হাসি। কারণ একটাই—তীব্র শ্রমিক সংকট। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে হঠাৎ বৃষ্টির শঙ্কা। সব মিলিয়ে দুই উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের হাজারো কৃষকের চোখে-মুখে এখন উৎকণ্ঠা আর হতাশার ছাপ।
ধান কাটার মৌসুমের শুরুতে শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ছিল ৭০০ থেকে ১২০০ টাকা। কয়েক দিনের ব্যবধানে সেই মজুরি বেড়ে এখন ১৪০০ থেকে ১৬০০ টাকায় পৌঁছেছে। তবুও প্রয়োজন অনুযায়ী শ্রমিক মিলছে না।
ফলে সময়মতো ধান কাটতে না পেরে অনেক কৃষকের পাকা ধান মাঠেই নুয়ে পড়ছে, কোথাও কোথাও বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। সারা বছরের ঘামঝরা পরিশ্রমে ফলানো ফসল চোখের সামনে নষ্ট হওয়ার শঙ্কায় দিশেহারা কৃষক।
ব্রাহ্মণপাড়ার চান্দলা, মাধবপুর, শিদলাই, দুলালপুর, মালাপাড়া, সাহেবাবাদ এবং বুড়িচংয়ের পীরযাত্রাপুর, বাকশীমূল, রাজাপুর, ষোলনল, ময়নামতি, ভারেল্লা উত্তর-দক্ষিণ ও মোকাম ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে—মাঠের পর মাঠ সোনালি ধানে ভরে আছে। কোথাও কৃষকেরা দল বেঁধে শ্রমিক খুঁজছেন, কোথাও পরিবার-পরিজন নিয়ে নিজেরাই ধান কাটায় নেমেছেন। তবুও সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ফসল ঘরে তোলা যেন কঠিন হয়ে উঠছে।
চান্দলা ইউনিয়নের সবুজপাড়া গ্রামের কৃষক আলী হাসান আক্ষেপ করে বলেন,”৭০ শতক জমিতে বোরো আবাদ করেছি। অনেক কষ্টে মাত্র ১৫ শতকের ধান ঘরে তুলেছি। বাকি ধান মাঠে পেকে আছে। শ্রমিকের দাম এত বেশি, তবুও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। বৃষ্টি হলে বড় ক্ষতি হয়ে যাবে।”
শিদলাই ইউনিয়নের পুমকারা গ্রামের কৃষক আব্দুল মান্নান বলেন,”৩০ শতক জমির ধান কাটতে পেরেছি, এখনও ৭০ শতক বাকি। শ্রমিক সংকটে ধান কাটতে দেরি হচ্ছে। আবহাওয়া খারাপ হলে সব পরিশ্রম পানিতে যাবে।”
উপজেলা কৃষি অফিস জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে ব্রাহ্মণপাড়ায় ৮ হাজার ৫৮০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ায় লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে আবাদ ও ফলন দুটোই হয়েছে আশাব্যঞ্জক। তবে শ্রমিক সংকট এখন কৃষকের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আব্দুল মতিন বলেন,”এবার উপজেলায় বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। কৃষকদের দ্রুত ধান কেটে ঘরে তোলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় কম্বাইন্ড হারভেস্টার মেশিন ব্যবহারে জোর দেওয়া হচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে দ্রুত ধান কাটার কাজ শেষ হবে বলে আশা করছি।”
মাঠভরা সোনালি ধান এবার কৃষকের স্বপ্ন নয়, শ্রমিক সংকট আর বৃষ্টির শঙ্কায় তা যেন হয়ে উঠেছে আতঙ্কের নাম।