রাত পোহালেই ভোট

আইন আদালত জাতীয় ঢাকা রাজনীতি সারাদেশ
শেয়ার করুন....,

রাত পোহালেই ভোট

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ

আজ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। দীর্ঘ প্রতীক্ষা, উত্তাল আন্দোলন, রক্তক্ষয়ী সংঘাত এবং এক অন্তর্বর্তী শাসনকাল পেরিয়ে বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে ব্যালটের সামনে।

চব্বিশের জুলাই-আগস্টের বিপ্লবোত্তর নতুন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সংযোজিত হতে যাচ্ছে। দেশের  ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৫ ভোটার মুখিয়ে আছেন নতুন বন্দোবস্তের জন্য।

এ দেশের মানুষ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে নাগরিক অধিকার আদায় করতে পারেনি শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসন ও শোষণে। দেশে ১৮-৩৫ বছর বয়সী তরুণ ভোটার রয়েছেন প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ। তারাই কাজ করবেন পরিবর্তনের নিয়ামক শক্তি হিসেবে। তরুণ ভোটারদের বড় একটি অংশ প্রথমবারের মতো ভোট দিতে যাচ্ছেন। তাদের চোখে এই নির্বাচন কেবল দল বাছাই নয়, বরং সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও আত্মমর্যাদার প্রশ্ন।

১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুধু ক্ষমতা বদলের প্রক্রিয়া নয়; এটি এক অর্থে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা বিনির্মাণ করবে। এমন এক সময়ে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার পতন, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে তীব্র টানাপোড়েন-সব মিলিয়ে ভোটের পরিবেশ যেমন উত্তেজনাপূর্ণ, তেমনি সংবেদনশীল।

নির্বাচন কমিশন আচরণবিধি কার্যকরে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ৪৮ ঘণ্টা আগে প্রচারণা বন্ধ, ৯৬ ঘণ্টা সভা-সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা, বহিরাগত ও যানবাহন চলাচলে কড়াকড়ি-সবই শান্তিপূর্ণ ভোটের লক্ষ্যে। তবে বাস্তবতা হলো, আচরণবিধি লঙ্ঘন ও সহিংসতার পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক।

সরকারি হিসাবে পাঁচজন, বেসরকারি হিসাবে আরও বেশি প্রাণহানি আমাদের সতর্ক করে দেয়, ভোট যেন আবারও রক্তে কলঙ্কিত না হয়। এ অবস্থায় প্রথম পরামর্শটি নির্বাচন কমিশনের প্রতি- আইন প্রয়োগে কোনো রকম শৈথিল্য দেখানো যাবে না।

আচরণবিধি লঙ্ঘনে ক্ষমতাধর দল বা জনপ্রিয় প্রার্থী-সবার জন্য একই মানদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে। ভোটের দিন প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দৃশ্যমান, নিরপেক্ষ ও পেশাদার থাকতে হবে, যাতে ভোটাররা আস্থা পান।

দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান-পরাজয়কে ভয় নয়, গণতন্ত্রের অংশ হিসেবে জনরায়  মেনে নেওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলুন। উত্তেজক বক্তব্য, শক্তি প্রদর্শন বা ফল ঘোষণার আগেই বিজয়োল্লাস পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করতে পারে।

বিশেষ করে তরুণদের আবেগকে সহিংস পথে ঠেলে দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। তৃতীয়ত, ভোটারদের দায়িত্ব সবচেয়ে বড়। ভয়, গুজব বা চাপের কাছে নত না হয়ে কেন্দ্রে গিয়ে নিজের ভোট নিজে দিন।

পোস্টাল ব্যালট, প্রবাসী ভোটসহ নতুন ব্যবস্থাগুলো অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে। এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে হবে। ভোট কেন্দ্রে অনিয়ম দেখলে আইনগত পথে প্রতিবাদ করাই হবে প্রকৃত নাগরিক আচরণ।

সবশেষে, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের কথাও মাথায় রাখতে হবে। এই নির্বাচন শুধু দেশের ভেতরেই নয়, বাইরের শক্তির দৃষ্টিতেও গুরুত্বপূর্ণ। একটি অংশগ্রহণমূলক, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই পারে বাংলাদেশকে কূটনৈতিকভাবে শক্ত অবস্থানে নিয়ে যেতে- হোক তা দিল্লি, বেইজিং বা অন্য যে কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে। আজ ভোট। এই   দিন যেন ভয়ের না হয়ে হয় প্রত্যাশার।

ব্যালট বাক্সের রায়ই হোক শেষ কথা-বুলেট, ষড়যন্ত্র বা আধিপত্যের নয়। গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা ফেরানোর এটাই হয়তো সবচেয়ে বড় সুযোগ।


শেয়ার করুন....,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *