
মাদকের ছোবলে বাড়ছে অপরাধ-রায়পুরে ইউএনও’র নেতৃত্বে অভিযান শুরু
তাবারক হোসেন আজাদ, লক্ষ্মীপুর:
লক্ষ্মীপুরের রায়পুরসহ চারটি উপজেলায় কোনভাবেই মাদক বিক্রি ও সেবন রোধ করা যাচ্ছে না।
প্রতিনিদিনই ৪-৫ জন মাদক কারবারি গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠালেও ও ৭-৮দিন পর জামিনে বের এসে আবারও শুরু করছে মাদক ব্যাবসা। ছেলের হাতে বাবা, স্বামীর হাতে স্ত্রী ও বন্ধুর হাতে বন্ধু হত্যাসহ নানা ধরনের অপরাধ ঘটে চলেছে অহরহ।
এছাড়াও প্রতিদিনই চুরি-ছিনতাই, কিশোর গ্যাংসহ সামাজিক অপরাধ ও বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এসব অপরাধের নেপথ্য খুঁজতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে অধিকাংশই ঘটনার পেছনেই রয়েছে মাদকের ছোবল। মাদক সেবনের জন্য টাকা না পেয়ে বৃদ্ধ মা-বাবাসহ পরিবারের সদস্যদের মারধর ও বাসাবাড়িতে ভাঙচুর করার ঘটনাও ঘটছে।
এ নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে। মাদক কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের হিসেব মতে, লক্ষ্মীপুর জেলায় মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন ৪২ জন।
গডফাদার ৮, পাইকারি বিক্রেতা ১৩ এবং খুচরা বিক্রেতা ১৯ জন। মঙ্গলবার (২৫ নভেম্বর) রায়পুর উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় একাধিক বক্তা-সাংবাদিক মাদকের কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে উপস্থাপ ন করেন।
রাজনৈতিক মদদ আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘ম্যানেজের’ কারণে আশানুরূপ সুফল আসছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। আইনশৃংখলা সভায় মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানের ঘোষনা এবং সকলের সহযোগিতা চেয়েছেন ইউএনও মেহেদী হাসান কাউছার। তার ভেরিফাইড ফেইসবুকে লিখেছেন-সুনির্দিষ্ট ঠিকানাসহ “মাদক সেবন ও বিক্রয়কারীর তথ্য ০১৭৮৮৫৭৭৭১১ এই নাম্বারে হোয়াটসঅ্যাপে দিন। আপনার পরিচয় গোপন রাখা হবে”। সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, মাদকরোধে আইনের শাসন আর রাজনীতিবীদদের অঙ্গীকার প্রয়োজন। এ ব্যবসার সঙ্গে জনপ্রতিনিধিরাও জড়িত। মাদক ব্যবসায়ীরা রাতারাতি কোটিপতি হয়।
এ লোভ অন্যদেরও টানে। এ সংকট রুখতে পারিবারিক-সামাজিক আন্দোলনের পাশাপাশি নৈতিকতা-মূলোবোধ জাগ্রত করার তাগিদ দিতে হবে। ‘গ্রামেও এখন রাজনৈতিক মদদে ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা বিক্রি হচ্ছে। মোবাইল ফোনে বিক্রেতার সঙ্গে চুক্তি করে চলার পথে মাদক হাতবদল হয়।
বিকাশে ও রিকশাতেও টাকা লেন দেন হয় বলে এক বিএনপি নেতা বিল্লাল হোসেন কবিরাজ ও সাংবাদিক এমআর সুমন।’ খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গ্রামগুলোতে ফেরি করে বিক্রি হচ্ছে ইয়াবা ও গাঁজা। এসব সেবনে নেশায় ডুবছে তরুণ-যুবকরা। এর প্রভাবে মাদকাসক্তদের ঘরে ঘরে দেখা দেয় অশান্তি। জানা যায়, গত বছর জেলায় মাদকাসক্তদের হাতে ৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
আলোচিত খবর ছিলো সদরের বশিকপুরে বসতঘরের দরজা তালা দিয়ে পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে দুই সন্তানসহ স্ত্রীকে হত্যা, রামগতির চরকলাকোপা গ্রামে কুপিয়ে স্ত্রী-শ্বশুরকে হত্যার অন্যতম।
গঙ্গাপুর গ্রামে ছেলের হাতে মা, উত্তর টুমচর গ্রামে ভাইয়ের হাতে ভাই খুন হওয়ারঘটনাঘটে।
এছাড়া গত ১ জুন মাদক ব্যবসার দ্বন্দ্বে লক্ষ্মীপুর সদরের উত্তর জয়পুরে আজাদ হোসেন বাবলু নামে একজনকে কুপিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষ। ১১ জুন রায়পুর উপজেলার উত্তর চরবংশী গ্রামে মাদক ব্যবসার প্রতিবাদ করায় বৃদ্ধ আলী দেওয়ানকে কুপিয়ে হত্যা করে মামুন নামে মাদকাসক্ত ছেলে। ১১ এপ্রিল সদরের পূর্ব চৌপল্লী গ্রামে মাদকের দ্বন্দ্বে রুবেল হোসেন নামে একজনকে গুলি করা হয়।
৯ এপ্রিল লক্ষ্মীপুর উত্তর তেমুহনীর নিউ মার্কেটের ছাদে কলেজছাত্র সিরাজ ৩ বন্ধুকে গাঁজা সেবনকালে ছাদ থেকে গেলে ঢাকায় নেওয়ার পথে তিনি মারা যায়।
১৫ মার্চ রাতে পৌরসভার কালু হাজী সড়কের ভাড়া বাসায় ঘুমন্ত স্ত্রী রিনা বেগমের দুই পায়ের রগ কেটে মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে জখম ও পাথর দিয়ে হাত-পা থেতলে নির্যাতনের অভিযোগ উঠে মদ্যপ স্বামী আলমগীরের বিরুদ্ধে।
এছাড়াও সদরের লতিফপুর গ্রামে প্রতিবাদ করায় ৮ সেপ্টেম্বর অষ্টম শ্রেণির ছাত্রসহ ১০ যুবকের বিরুদ্ধে মামলা করে মাদক কারবারি আবুল কালাম জহির। তিনি ৬ মাদক মামলার আসামি ও পুলিশের তালিকাভুক্ত ব্যবসায়ী।
‘মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে কঠোর অবস্থান প্রয়োজন। মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে পুলিশ যথাযথ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করলেও মানুষ আদালতে সাক্ষ্য দেয় না। মাদকের সঙ্গে পুলিশের কোনো দুর্বলতা-আপস নেই। এর উদ্ধার ও বিক্রেতাদের গ্রেফতারে নিয়মিত অভিযান চলছে বলে এসআই হায়াত জানান।
’ র্যাব-১১ জানায়, ২০২৩ সালের ৩ জানুয়ারি লক্ষ্মীপুরে সবচেয়ে বড় ইয়াবার চালানসহ সদরের চর রমনী ইউপি সদস্য (মেম্বার) মনির হোসেনের কাছে ৮৫ হাজার ইয়াবা পাওয়া যায়। মনির ও তার সহযোগীদের তথ্য মতে, কয়েক ধাপে লক্ষাধিক ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, ৯ মার্চ ও ২৩ অক্টোবর রাতে রায়পুরে ইয়াবা-গাঁজাসহ মাদক সম্রাট দেলোয়ার হোসেন মাইকেল ও পরান হোসেন কে গ্রেফতার করা হয়। ওই দুই যুবকের বিরুদ্ধে থানায় ২১টি মামলা রয়েছে। তারা গ্রেফতার হলে আইনের ফাঁক দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে জামিনে বের হয়ে ফের এ ব্যবসা শুরু করেন। অন্য মাদক কারবারিদেরও একই অবস্থা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৬ সালে লক্ষ্মীপুর জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কার্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়। এর আগে নোয়াখালী থেকে এ জেলা নিয়ন্ত্রণ করা হতো। সদর, রায়পুর, রামগঞ্জ, কমলনগর ও রামগতিতে গত এক বছরে তাদের ১ হাজার ৩১৫টি অভিযান হয়।
এসময়ে প্রায় ৪ হাজার পিস ইয়াবা, ৫৬ কেজি গাঁজা, দেশীয় মদ উদ্ধার হয়। এসব ঘটনায় ১৫৬৬টি মামলায় ১৬৮৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়।
লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশ বিভাগ জানান, গত দেড় বছরে অভিযানে ১৮ হাজার ৭৫৪ পিস ইয়াবা, ৪ মণ গাঁজাসহ বেশ কিছু বিদেশি ও চোলাই মদ উদ্ধার করা হয়। এসব ঘটনায় ২৬০টি মামলায় ৩৭৫ জন গ্রেফতার করা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে রায়পুর ও সদর উপজেলার তিনজন ইউপি চেয়ারম্যান ও চারজন রাজনৈতিক ব্যাক্তি জানান, গ্রামেও এখন রাজনৈতিক মদদে ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা বিক্রি হচ্ছে।
মোবাইল ফোনে বিক্রেতার সঙ্গে চুক্তি করে চলার পথে মাদক হাতবদল হয়। বিকাশেও টাকা লেনদেন হয়। মাদক সহজলভ্য হওয়ায় আটক হলেও কয়েকদিন পরই জামিনে মুক্ত হচ্ছে জানিয়ে রায়পুর উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি মাহবুবুল আলম মিন্টু বলেন, আইনের শাসন আর রাজনীতিবিদদের অঙ্গীকার প্রয়োজন। মাদক কারবারিরা রাতারাতি কোটিপতি হয়। এ লোভ অন্যদেরও টানে। মামলার দুর্বলতার কারণেই আসামিরা জামিনে বেরিয়ে ফের ব্যবসা করছে।
আমরা-লেখলেও লাভ নেই। জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কার্যালয়ের পরিদর্শক আবদুর রহিম বলেন, লক্ষ্মীপুরে মাদকের ব্যবহার ও বিক্রি আগের চেয়ে তুলনামূলক কিছুটা বেড়েছে। রাজনৈতিক মদদে অনেকে এ ব্যবসা করছেন। আমাদের নিয়মিত অভিযান চলছে। পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রতিমাসেই স্কুল-কলেজে সভা,বিতর্ক প্রতিযোগিতা করছি।
রায়পুর পৌর বিএনপি নেতা শফিকুল আলম আলমাস বলেন, মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রনে পুলিশকে আরও বেশি সক্রিয় হতে হবে।
এজন্য পুলিশ, সেনাবাহিনীসহ যৌথ অভিযান প্রয়োজন। সকলের সহযোগিতাও প্রয়োজন। এই মাদকের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে সরকারি কলেজ, মহিলা কলেজ, জ্বিনের মসজিদ, বাসটার্মিনাল ও নদীর পাড়ে ওয়াবদা মাঠেসহ কয়েকটি জায়গায় কিশোর গ্যাং আড্ডা চলে।
রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান কাউসার বলেন, রাজনৈতিক ব্যাক্তিসহ সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা হলে মাদক নির্মুল করা সম্ভব।
মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে কঠোর অবস্থান প্রয়োজন। মাদকের সঙ্গে প্রশাসন বা পুলিশের কোনো দুর্বলতা-আপস থাকবেনা।
আজ মঙ্গলবার থেকে আমার নেতৃত্বে মাদক উদ্ধার ও বিক্রেতা গ্রেফতারে অভিযান চলবে।