
আত্মগোপনে থেকে সাংবাদিককে ৩০ লাখ টাকার প্লট উপহার দিলেন রাজশাহী সিটি মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন
শিবলী সাদিক, রাজশাহীঃ
রাজশাহী সিটি মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন রাজশাহীর যে সাংবাদিককে ৩০ লাখ টাকা মূল্যের প্লট উপহার দিয়েছেন তার নাম সৌরভ হাবিব।
মেয়রের কোটায় নগরীর তেখাদিয়া হাউজিং এস্টেট প্রকল্পে তিন কাঠার প্লট বাগিয়েছে সৌরভ। এই প্লটের বাজার মূল্য এখন কোটি টাকা।
সৌরভ হাবিব সিলভার কালারের টয়োটা গাড়িতে ঘোরেন। যার নম্বর ঢাকা মেট্রো গ-৩১-৯৮২৪। শোনা যাচ্ছে, গাড়িটি কেনা মেয়রপত্নী শাহীন আক্তার রেণীর টাকায়। যদিও এই গাড়ি কেনার নামে বাগমারা আসনের সাবেক মেয়র আবুল কালাম আজাদের কাছে ৫ লাখ টাকা নিয়েছেন সৌরভ। সৌরভ হাবিব মেয়র লিটনের কন্যা অর্না জামানের সাথে নগরীতে ফ্ল্যাট কিনেছেন বলেও প্রচার আছে।
সৌরভ হাবিব বেসরকারি টেলিভিশন ডিবিসি এবং সমকালের রাজশাহী প্রতিনিধি। তার বাবার নাম সিরাজুল ইসলাম। তার বাবার আদি নিবাস ঢাকার বিক্রমপুরে। পুঠিয়ার ঢাকাপাড়ায় (বিক্রমপুর) স্থায়ী হয়েছেন।
রাজশাহীতে শূন্য হাতে এসে সৌরভ হাবিব এখন কোটিপতি। আর এসবই হয়েছে মেয়র পরিবারের ছত্র-ছায়ায়। জেলা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন এমন পরিচয়ে মেয়র পরিবারের সাথে ঘনিষ্ট হন। নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান হিসেবেও পরিচয় দেন।
সিটি নির্বাচনে মেয়র লিটনের সংবাদ প্রচারের ঠিকাদারি নেন সৌরভ। মেয়রের প্রচারে যুক্ত করেন মোস্তাফিজুর রহমান মিশুকে। মিশু পরে জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান। মিশুর মাধ্যমে নগর ভবনে নিজের অবস্থান পোক্ত করেন সৌরভ। মিশু-সৌরভ ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা টিটু মিলে গড়ে তোলেন নিয়োগ সিন্ডিকেট। হাতিয়ে নেন মোটা টাকা। এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে মেয়রের নাম করে নগরীতে জমি-ফ্ল্যাট দখল, তদবির বাণিজ্য এমনকি চাঁদাবাজিতে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
সৌরভ হাবিব আপদমস্তক দুর্নীতিবাজ, ধান্দাবাজ, লুটেরা। প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, তিনি আপন ভাইকে বঞ্চিত করে তার বাবার কাছ থেকে সমস্ত সম্পত্তি লিখে নেন। এনিয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে ধারালো হাসুয়ার কোপ দেন ভাই। সেই কোপ ঢাকতে এখন কলার উঁচিয়ে চলেন সৌরভ। তার ঘনিষ্টরা এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। অবশ্য কেউ কেউ বলেন, ভাবিকে ধর্ষণ চেষ্টায় বড়ভাই তাকে কুপিয়েছিলেন। তবে এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সৌরভ হাবিব সাংবাদিকতাকে পুঁজি করে সবসময় অনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন। খাদ্য কর্মকর্তার অনিয়মের খবর প্রচারের ভয় দেখিয়ে বাগিয়ে নেন ওএমএস ডিলারশীপ।
তথ্যের ঠিকাদার বলতে যা বোঝাই-সৌরভ হাবিব সেটিই। তিনি নির্বাচন কেন্দ্রিক প্রচারণার নামে এমপি-মেয়র ও চেয়ারম্যানদের কাছে ঠিকাদারি নেন। বিনিময়ে আদায় করেন লাখ লাখ টাকা। তার এই তথ্যের ঠিকাদারি সিন্ডিকেটে রয়েছেন এটিএন নিউজ এর বুলবুল হাবিব, নিউজ টোয়েন্টিফোরের মতিউর মার্তুজাসহ একদল উঠতি সাংবাদিক। গত নির্বাচনেও ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি রকি কুমার ঘোষের অনুসারী এক প্রার্থীর প্রচারণার নামে ৩ লাখ টাকা নেন সৌরভ।
কেবল তথ্যের ঠিকাদারি নয়, নিউজ কিলিংয়েও উস্তাদ সৌরভ হাবিব। নিজে বিভিন্ন ঠিকাদার-রাজনৈতিক নেতা এবং বিভিন্ন দপ্তরের প্রধানদের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে জিম্মি করতেন। পরে লাখ টাকায় রফাদফা করতেন। তার অফিসেও অন্যান্য সাংবাদিকদের নিউজ সংক্রান্ত দফারফা চলে। প্রচার রয়েছে- লাখ টাকা না হলে কথা বলেননা সৌরভ। পক্ষে-বিপক্ষে নিউজ করার নামেও চলে বাণিজ্য।
কথায় আছে, পয়সা হলে মানুষের ভোটে দাঁড়ানোর খায়েশ হয়। কিন্তু সৌরভ হাবিবর ভোটে দাঁড়ানোর খায়েশ আছে। কিন্তু তা পয়সা খরচের জন্য নাম, কামানোর জন্য। তিনি অন্তত চার বার সাংবাদিক ইউনিয়নের ভোট করেছেন। কিন্তু৫-৭টি ভোটের বেশি পাননি। প্রত্যেকবার মেয়র-এমপি-মন্ত্রীদের কাছে থেকে ২ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা করে আদায় করেছেন। প্রচার আছে, টাকা হাতানোর জন্যই সৌরভ ভোটে দাঁড়ান।
এবার ফেরা যাক কুখ্যাত এই সাংবাদিকের পরিবারের দিকে। অভিযোগ রয়েছে, তার বাবা সিরাজুল ইসলাম কুখ্যাত জুয়াড়ি। একাধিকবার পুঠিয়া থানায় আটক হয়েছেন, একাধিক মামলাও রয়েছে। একবার তার বাবাকে গ্রেপ্তার করেন পুঠিয়ার তৎকালীন ওসি হাফিজুর রহমান। ওই সময় যমুনা টিভির ব্যুরো প্রধান শিবলী নোমান এবং বাংলাদেশ প্রতিদিনের নিজস্ব প্রতিবেদক কাজী শাহেদের তদবিরে বাবাকে ছাড়িয়ে আনেন।
তার মামা পুঠিয়া উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান জিএম হিরা বাচ্চু।
মেয়র লিটনের প্রেসক্রিপশনে মামাকে জিতিয়ে আনেন সৌরভ। সেইবার মামার হয়ে প্রভাব খাটাতে টিভি ক্যামেরা নিয়ে বিজিবি ক্যাম্পে ঢুকে গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন।
পরে মামার সহায়তায় পুঠিয়া রাজবাড়ির দীঘিসহ বেশ কয়েকটি পুকুর-দীঘি নামমাত্র ইজারামূল্যে দখলে নেন। গড়ে তুলেছেন গরু ও মাছের বাণিজ্যিক খামার।
তার ছোট বোন সোনিয়া তাসমিন। রাজশাহীর একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করেছেন। অভিযোগ রয়েছে তার সনদ জাল। তা সত্ত্বেও সাংবাদিকতার প্রভাব খাটিয়ে ২০২১ সালে বোনকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী পদে চাকরি নিয়ে দেন। বিতর্কের মুখে সেখানে যোগদান করতে না পেরে সম্প্রতি নগর ভবনে চাকরি নিয়ে দেন।
জয় বাংলার এম্বাসেডর সেজে সৌরভ হাবিব তার বউয়ের চাকরি নিয়েছে রাজশাহী বিভাগীয় পুলিশ লাইন হাসপাতালে।
পরে স্ত্রীকে রাজশাহীর ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চাকরি নিয়ে দেন। স্ত্রীর ৫০ ভরির স্বর্ণালংকার থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন আয়কর নথিতে। যতদূর জানা যায় তার শ্বশুর ততটা অবস্থাপন্ন নন।