
গাজীপুরে পুলিশ ‘আরআই সিন্ডিকেটের’ পদায়ন
বাণিজ্য ও কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগ
গাজীপুর প্রতিনিধি:
গাজীপুর জেলা পুলিশ লাইন্সে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও সরকারি বিধি-বিধানের তোয়াক্কা না করে একচ্ছত্র দুর্নীতির সাম্রাজ্য গড়ে তোলার মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে।
জেলা পুলিশ সুপারের (এসপি) কোনো প্রকার পূর্বানুমতি বা সরকারি অনুমোদন ছাড়া এবং ডিও বাইপাস করে অবৈধ অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন সদস্যদের পছন্দের দপ্তরে পদায়ন (অ্যাটাচমেন্ট) দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সংরক্ষিত পুলিশ পরিদর্শক (আরআই) মোঃ অহিদ উল্লাহ (বিপি-৬৯৮৮০৮৮৯৩৩)-এর নেতৃত্বে এবং আরআই কার্যালয়ের প্রধান ক্যাশিয়ার কনস্টেবল নং ১৫৪০, মোঃ তারিকুল ইসলাম (বিপি-৯৭১৭২১১৬০৭)-এর মাধ্যমে এ বিশাল পদায়ন বাণিজ্য পরিচালিত হচ্ছে।
অনৈতিক অর্থ লেনদেনের নথি প্রকাশ: প্রাপ্ত দাপ্তরিক নথি অনুযায়ী, ‘আরআই পুলিশ লাইন গাজীপুর জেলা এর নিজস্ব ক্ষমতাবলে পুলিশ সুপার মহোদয়ের ডিও ছাড়া বিভিন্ন দপ্তরের জনবলের নামের তালিকায় সুস্পষ্ট আর্থিক হিসাব ধরা পড়েছে।
জেলা পুলিশের আওতাধীন ওয়াটার ট্রিটমেন্ট অপারেটর, অস্ত্রাগার, মেহমানখানা, রেশন স্টোর এবং বিচারকের দেহরক্ষী পদায়নের নামে ৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
তালিকা অনুযায়ী ঘুষ লেনদেনের বিস্তারিত: এএসআই (সশস্ত্র/৩২৮) নাজমুল হোসেন (বিপি-৯৩১২১৫০৭১৩): ওয়াটার ট্রিটমেন্ট অপারেটর—১৩,০০০ টাকা। এএসআই (সশস্ত্র/৪৮১) মোঃ মোজাম্মেল হক (বিপি-৭৮৯৭০৩০৫৩৯): ওয়াটার ট্রিটমেন্ট অপারেটর—২০,০০০ টাকা। কনস্টেবল (৪০৬) মোঃ শামীম মিঞা (বিপি-৯৯১৮২১২১৬৬): আরআই অফিস—৫,০০০ টাকা। কনস্টেবল (১৯৪৭) রাকিব হাসান (বিপি-৯৯১৮২১৬০৩১): আরআই অফিস—১২,৫০০ টাকা। কনস্টেবল (১৮৫৬) তপন (বিপি-৯৯১৮২১৯৪০৪): আরআই অফিস—১০,০০০ টাকা। কনস্টেবল (১৯২০) মহিদুল ইসলাম (বিপি-০১২২২NDE০৭৯): অস্ত্রাগার—৪,৫০০ টাকা। কনস্টেবল (১৬৫৪) আমিনুল ইসলাম (বিপি-৯৮১৮২০৯৪৬০): মেহমানখানা—১০,০০০ টাকা।
কনস্টেবল (১৮৩৭) জিহাদ খান (বিপি-৯৭১৮২১২৭৪৭): জেলা দায়রা জজ আদালতের দেহরক্ষী—২০,০০০ টাকা। কনস্টেবল (১৩৩৮) আরজু (বিপি-০৭২৬২৬৬৩৩৬): সি-স্টোর—১০,০০০ টাকা। নারী কনস্টেবল (১১৯৫) মাহমুদা আক্তার (বিপি-৯৮১৮২২০৭৫৫): রেশন স্টোর—৬,০০০ টাকা।
ভালো কাজের পুরস্কারের বিল ও ভূয়া স্বাক্ষরে টাকা আত্মসাৎ: পদায়ন বাণিজ্যের পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের জন্য দেওয়া রাষ্ট্রীয় পুরস্কারের টাকা হড়প করার মতো গুরুতর তথ্য উঠে এসেছে।
গাজীপুর পুলিশ সুপার মহোদয় জেলা পুলিশের যেসকল সদস্যকে ভালো কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ আর্থিক পুরস্কার প্রদান করেন, সেই টাকা সদস্যদের না দিয়ে পুরোটাই হাতিয়ে নিচ্ছেন আরআই ও ক্যাশিয়ার তারিকুল। নিয়ম অনুযায়ী পুরস্কার বিল পাওয়ার সাথে সাথে তা অফিসিয়াল গ্রুপে দেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট থানা-ফাঁড়িতে অবগত করার কথা থাকলেও ক্যাশিয়ার তারিকুল তা গোপন রাখেন।
গাজীপুর জেলা থেকে যেসব সদস্য অন্য ইউনিটে বদলি হয়ে গেছেন, তাঁদের না জানিয়ে তাঁদের নামে বরাদ্দকৃত টাকা আরআই ও ক্যাশিয়ার তারিকুল জালিয়াতির মাধ্যমে উত্তোলন করছেন। নিজেরা ভুয়া ও নকল স্বাক্ষর করে বিলের শিট পুলিশ অফিস হিসাব শাখায় জমা দিয়ে পুরো টাকা আত্মসাৎ করা হচ্ছে। হিসাব শাখার জমা দেওয়া বিলের শিট নিরপেক্ষ তদন্ত করলেই এই জালিয়াতির সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যাবে। বদলি লুকানো ও দাপ্তরিক জালিয়াতি: অভিযোগ রয়েছে, পুলিশের অভ্যন্তরীণ বদলি আদেশ গোপন করা কিংবা বদলিকৃত স্থানে যোগ না দিয়ে পুরোনো পদে বহাল রাখতে আরআই মোঃ অহিদ উল্লাহ ও ক্যাশিয়ার তারিকুল ইসলাম সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কাগজপত্র তৈরি করতেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের সুস্পষ্ট স্মারক বা নির্দেশ এলেও তা চেপে রেখে অর্থের বিনিময়ে অনৈতিক সুবিধা দেওয়া হতো।
পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি রক্ষা এবং শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে জালিয়াতি ও চুরির অপরাধে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তাত্ক্ষণিক বিভাগীয় মামলা দায়ের এবং চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত সহ কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের জোরালো দাবি উঠেছে।