
ব্রাহ্মণপাড়ায় চাচার বিয়েতে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে
মৃত শিহাব পেয়েছে জিপিএ-৫
সৌরভ মাহমুদ হারুন, ব্রাহ্মণপাড়াঃ
বাড়িতে ছিল বিয়ের আনন্দ। স্বজনদের আনাগোনায় মুখর ছিল চারপাশ। সেই আনন্দের অংশ হতে গাজীপুর থেকে গ্রামের বাড়িতে এসেছিল মেধাবী কিশোর শাহরিয়ার হোসেন শিহাব (১৭)।
সামনে ছিল এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের অপেক্ষা। পরিবারের স্বপ্ন ছিল, কাঙ্ক্ষিত ফল হাতে পেয়ে সবাইকে নিয়ে আনন্দ করবে শিহাব।
কিন্তু সেই আনন্দ আর উপভোগ করা হলো না তার। চাচার বিয়ের অনুষ্ঠানে এসে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় শিহাব। মৃত্যুর দুই দিন পর প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে সে জিপিএ-৫ পেয়েছে।
কাঙ্ক্ষিত সেই সাফল্যের খবর পরিবার পেলেও পাশে নেই প্রিয় সন্তান। তাই জিপিএ-৫-এর আনন্দও যেন পরিবারের কাছে আজ কান্না আর শোকের ভারী বোঝা।
নিহত শাহরিয়ার হোসেন শিহাব কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার শশীদল ইউনিয়নের মানরা গ্রামের গাজীর বাড়ির মো. তফাজ্জল হোসেনের ছেলে। তফাজ্জল হোসেন পেশায় একজন বেসরকারি চাকরিজীবী। দুই ভাই-বোনের মধ্যে শিহাব ছিল সবার বড়।
পরিবার নিয়ে গাজীপুরে বসবাসের সুবাদে সে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ঢাকা বিমানবন্দর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এ বছর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, ছোট চাচার বিয়েতে যোগ দিতে পরিবারের সঙ্গে গাজীপুর থেকে গ্রামের বাড়িতে এসেছিল শিহাব। ৮ জুলাই বৌভাতের আয়োজন চলছিল বাড়িতে। দুপুরে গোসল শেষে ভেজা কাপড় শুকাতে বাড়ির ছাদে ওঠে সে। কাপড় ছাদের কার্নিশে দিতে গেলে ডেকোরেশনের মরিচবাতির বৈদ্যুতিক তারে জড়িয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয় শিহাব। মুহূর্তেই ছাদ থেকে নিচে পড়ে গুরুতর আহত হয় সে।
স্বজনরা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক শিহাবকে মৃত ঘোষণা করেন।
শিহাবের মৃত্যুর খবরে মুহূর্তেই বিয়ের বাড়ির আনন্দ পরিণত হয় শোকে। যে বাড়িতে বিয়ের আনন্দে হাসি-আনন্দে মুখর থাকার কথা ছিল, সেখানে নেমে আসে কান্নার মাতম। স্বজনদের চোখে তখন শুধু হারানোর বেদনা—একটি সম্ভাবনাময় জীবনের এমন আকস্মিক পরিণতি কেউই মেনে নিতে পারছিলেন না।
এরই মধ্যে সোমবার (১০ আগস্ট) প্রকাশিত হয় এসএসসি পরীক্ষার ফল। ফলাফলে শিহাব জিপিএ-৫ পেয়েছে—এই খবর পৌঁছে যায় পরিবারের কাছে। কিন্তু যে ফলাফল নিয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে আনন্দ করার কথা ছিল, সেই ফলাফলই এখন তাদের কাছে সন্তানের স্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শশীদল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান রিয়াদ বলেন, “মেধাবী ছাত্র শিহাবের এমন আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ছেলেটি ভালো পরীক্ষা দিয়েছিল, কিন্তু নিজের এই মেধার স্বাক্ষর আর দেখে যেতে পারল না। মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরপরই আমি তাৎক্ষণিকভাবে তার বাড়িতে গিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের খোঁজখবর নিই। এই অসমাপ্ত স্বপ্নের বেদনা মেনে নেওয়া সত্যিই কঠিন।”
শিহাবের জিপিএ-৫ তার মেধা ও পরিশ্রমের স্বীকৃতি হয়ে থাকবে। কিন্তু সেই সাফল্যের দিনে সন্তানকে পাশে না পাওয়ার শূন্যতা কোনো অর্জন দিয়েই পূরণ হওয়ার নয়। পরিবারের কাছে তাই এবারের এসএসসি ফলাফল আনন্দের নয়—এটি প্রিয় সন্তানকে হারানোর বেদনার সঙ্গে মিশে থাকা এক গভীর স্মৃতি।