
প্রয়াণ দিবসের পর কাঙাল হরিনাথের জন্মজয়ন্তী কাটল নীরব
হৃদয় রায়হান, কুষ্টিয়াঃ
গ্রামীণ সাংবাদিকতার পথিকৃৎ কাঙাল হরিনাথ মজুমদার ১৮৩৩ সালের ২০ জুলাই কুষ্টিয়ার কুমারখালীর কুন্ডুপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন।
গত সোমবার ছিল তাঁর ১৯৩তম জন্মজয়ন্তী।
উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা না থাকায় কুমারখালীতে অবস্থিত কাঙাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘরে এদিন তেমন কোনো আয়োজন ছিল না। শুধু মাত্র তাঁর ম্যুরালে পুষ্পস্তবক অর্পনের মাধ্যমেই দিন উদযাপন করা হয়। এমনকি কোনো কর্মসূচি নেয়নি উপজেলা প্রশাসনও।
এতে ক্ষুব্ধ কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের বংশধর, গণমাধ্যমকর্মী, সুশীল সমাজ ও স্থানীয়রা। তাঁদের ভাষ্য, দাঁয়িত্বশীল কর্মকর্তাদের অবহেলা ও নানান অযৌক্তিক অজুহাতে এই গুণী মানুষটির জন্ম ও মৃত্যু দিবস যথাযথ মর্যাদায় পালন করা হয়না।
অন্তত এই দিন দুটিকে জাতীয়ভাবে পালনের আয়োজনের দাবি তাঁদের। ১৮৯৬ সালের ১৮ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন কাঙাল হরিনাথ মজুমদার। ১৮৬৩ সালের এপ্রিলে কুমারখালী থেকে ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ নামে মাসিক পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন। তাঁর স্মরণে কুমারখালীতে একটি স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণ হয়েছে। কিন্তু অযত্ন-অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে তাঁর বাস্তুভিটা ও সমাধি।
গতকাল সোমবার বিকেলে কুমারখালী পৌরসভার কার্যালয়ের পাশে অবস্থিত স্মৃতি জাদুঘরে দেখা গেছে, তাঁর ম্যুরালে জাদুঘরের কর্মচারীরা দায়সারাভাবে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেছেন এবং ফুলের মালা দিয়েছেন।
প্রধান ফটকে ঝুলছে তালা। আঙিনা জুড়েই সুনসান নীরবতা। নেই কোনো সাজসজ্জা বা আয়োজন।
কাঙাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘরের তত্ত্বাবধায়ক তাপস কুমার মণ্ডল বলেন, ‘আজ (সোমবার) কাঙাল হরিনাথের ১৯৩তম জন্মদিবস। এখানকার সকল সিদ্ধান্ত জাতীয় জাদুঘর থেকে নেওয়া হয়। সেখানকার প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দিবসটি উপলক্ষে প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধাঞ্জলী অর্পণ করা হয়েছে। এবং কাঙাল হরিনাথের ইতিহাস ছড়িয়ে দিতে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ডেকে এনে জাদুঘরটা ঘুরিয়ে দেখানো হয়েছে।’ তাঁর ভাষ্য, দিবসটি নীরবে চলে যাচ্ছে ব্যাপারটা তেমন না। জাতীয় জাদুঘরে ব্যাপকভাবে অনুষ্ঠানের আয়োজন আছে।
জানা গেছে, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রীর সিডিউলের অজুহাতে ১৮ এপ্রিল কাঙাল হরিনাথের ১৩০তম মৃত্যু বার্ষিকীতে ছিল না কোনো আয়োজন। শুধু তাঁর ম্যুরালে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও একটি বৃক্ষরোপণের মাধ্যমেই শেষ হয়েছিল।
এতে চরম ক্ষুব্ধ কাঙাল হরিনাথের চতুর্থ বংশধর মৃত অশোক মজুমদারের স্ত্রী গীতা রানী মজুমদার (৬৮)।
সেই অভিমানে জন্মজয়ন্তীতে সাংবাদিকদের ক্যামেরায় কথা বলতে রাজি হননি তিনি। তবে গীতা আক্ষেপ করে বলেন, এসব বলে কোনো লাভ নেই। যে কাঙাল, সে কাঙালই রয়ে গেছে। ‘কাঙাল ভাঙিয়ে অনেকেই খাইল। তবে যে কাঙাল, সে কাঙালই আছে।
কাঙালের মতন যাচ্ছে তাঁর তিরোধান দিবস। তাঁর নামের আগেও কাঙাল, পরেও কাঙাল।’ ২০২৫ সালে কর্মকর্তার বিয়ের অজুহাতে যথাসময়ে দিবস পালিত হয়নি।
এ বছর মন্ত্রীর অজুহাতে মৃত্যদিবস পালন হয়নি। আজ উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অজুহাতে পালন হলোনা।
এটা এক ধরনের অবমাননা ও প্রথিতযশা সাংবাদিকবে অসম্মান বলে মনে করেন কুমারখালী প্রেসক্লাবের সভাপতি কে এম আর শাহীন। তিনি বলেন, আর কোনো অজুহাত নয়।
আগামীতে জাতীয়ভাবে দিবস দুটি পালনের দাবি তাঁর। ‘সংবাদপত্র, সাংবাদিকতা ও গ্রামীণ সাংবাদিকতার কিংবদন্তি কাঙাল হরিনাথ’ বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় কবি ও সাহিত্যিক লিটন আব্বাস।
তিনি বলেন, ‘শুধু প্রশাসন বা সাংবাদিক নয়; কবি, সাহিত্যিক, লেখক ও সুশীলদেরও উচিত ছিল দিনটির মর্যাদা দেওয়া।
কিন্তু বাস্তবে একদমই মূল্যায়ন হচ্ছেনা। অবশ্যয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, লালন শাহসহ অন্যান্য মনীষীদের মতোয় দিবস গুলো পালন করা উচিৎ। সরকারিভাবে কোনো নির্দেশনা না থাকায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো আয়োজন ছিলোনা বলে জানিয়েছেন উপজেলা সহকারী কমিশনার ( ভূমি) নাভিদ সারওয়ার।
তিনি বলেন, এই গুণী মানুষটির জন্ম–মৃত্যু দিবস জাতীয়ভাবে পালন করা যৌক্তিক। ভবিষ্যতে এমন আয়োজনের জন্যে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষে জানানো হবে।