
লক্ষ্মীপুরে ৩৫টি স্বাস্থ্য-পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে যান না চিকিৎসকরা ক্ষুদ্ধ রোগীরা
তাবারক হোসেন আজাদ, লক্ষ্মীপুর:
লক্ষ্মীপুরে ৩৫টি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র গুলোতে পদায়ন থাকলেও সেখানে যান না চিকিৎসক।
মেডিকেল অফিসারের পদায়ন থাকলেও ক্ষনিকের জন্য গেলেও নানা অজুহাতে শহরের নিজস্ব চেম্বারে চলে আসনে।
বুধবার (৮ এপ্রিল) দুপুর ১০টায় অফিসে ঢুকেই দস্তখত দিয়ে ১১টায় মেডিকেল অফিসার ডাক্তার আবদুল্লাহ আল নোমান জেলা শহরে চলে যান বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। গত তিন বছর ধরে তিনি দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা করছেন।
অপরদিকে-রায়পুরসহ জেলার কার্যালয়সহ ৫টি উপজেলার কার্যালয়গুলোতে ১৬৫টি পদই শুণ্য এবং বেহাল অবস্থা এসব স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ভবনগুলোর। রায়পুরসহ জেলার কয়েকটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র খুবই জরাজীর্ণ অবস্থা। সেখানে শুধু নারীদের সেবা দিচ্ছে বিএফডব্লিও । চাহিদা অনুযায়ী সেবা পাচ্ছেন না রুগীরা।
গত ১৫ বছর কোন নিয়োগ নেই বেশিরভাগ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে। যেখানে আছে সেখানেও যান না চিকিৎসকরা। স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে ভিজিট করেননা এবং চিকিৎসাও দিচ্ছেননা। ডাক্তার না থাকা ও তদারকি না করায় ডেলিভারি করার নামে সেবাগ্রহিতাদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এফডব্লিওরা।
কাগজে-কলমে বছরের পর বছর পদায়ন থাকলেও তাদের চেনেন না এলাকার মানুষ। এভাবেই চলছে লক্ষ্মীপুরে জেলার-স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো।
এতে চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন না প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ। সেবা নিতে তাদের ছুটতে হয় গ্রাম থেকে জেলা সদর হাসপাতালে।
জেলায় অনুমোদিত পদ উপপরিচালক ও সহকারি পরিচালকসহ ৬১৮ জন। তার মধ্যে মেডিকেল অফিসার (সিসি)-১ জনে ১ জন, উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা-৫ জনে ৩ জন, মেডিকেল অফিসার (এমসিএইচ-এফপি) ও পরিবার কল্যাণ) দুইজন।
সহকারি উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ৯ জনে ৮ জনই নাই।
উপ-সহকারি কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার ৩১ জন ২১ জনই নাই, ফার্মাসিষ্ট১১ জনে-৮ জনই নাই, পরিবার কল্যান পরিদর্শিকা ৩০ জন, পরিবার কল্যাণ সহকারি ১২৯ জনসহ মোট ১৬৫টি শুণ্য। খুব করুন অবস্থা ও দূর্নীতিতে ভরপুর সদর, রামগন্জ, কমলনগর ও রামগতি উপজেলায়।
লক্ষ্মীপুর সিভিল সার্জন অফিসের দেয়া তথ্য মতে, জেলার ৫টি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ৩৫ টি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র রয়েছে। সেগুলো হলো-.সদর উপজেলায় ১৭টি, রায়পুর উপজেলায় ৭টি, রামগন্জ উপজেলায় ২টি, কমলনগর উপজেলায় ২টি ও রামগতি উপজেলায় ৬টি ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র। এই কেন্দ্রগুলো ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়।
উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে প্রতিদিন প্রায় ১৫শ থেকে ২ হাজার মানুষ চিকিৎসা সেবা নিতে আসেন।
স্বাস্থ্য বিভাগ আরো জানায়, এই উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ৬টি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসক পদায়ন ও ১টিতে পদ শূন্য রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে পদায়ন থাকলেও সেখানে যান না চিকিৎসক।
সহকারী মেডিকেল অফিসারের পদায়ন থাকলেও নানা অজুহাতে সেখানে যান না অনেকে। একইসঙ্গে বেহাল অবস্থা এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভবনগুলোরও। সর্বশেষ ২০১৯ সালে কিছুটা মেরামতের কাজ করা হয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রেরই জরাজীর্ণ অবস্থা। সেখানেই সেবা দিচ্ছেন কর্মকর্তারা। চাহিদা অনুযায়ী সেবাপাচ্ছেনা সেবাপ্রত্যাশীরা।
রায়পুরের চরপাতা উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ম্যাডিকেল অফিসারে পরিবর্তে চিকিৎসা দিতে দেখা যায় পরিবার কল্যান পরিদর্শিকাকে। ঠাণ্ডা জ্বরের ওষুধ দেয়াসহ সবকাজ করছেন পরিদর্শিকা। অনেক রোগীকে দেখা গেছে চিকিৎসা না নিয়েই ফেরত যেতে। একই অবস্থা বিরাজ করছে জেলার ৫টি উপজেলার উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে।
অপরদিকে চিকিৎসকসহ জনবল পদায়ন না হওয়ায় প্রায় এক বছর বেশি সময় আগে বন্ধ হয়ে গেছে রায়পুরের সোনাপুরসহ জেলার কয়েকটি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র। খুলে পড়ছে ইট ও পলেস্তারা। চুরি হয়ে গেছে জানালা-দরজা। পরিণত হয়েছে জোপঝাড়ে। অথচ সরকারি খাতায় এখনো চালু উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো।
রায়পুরে চরপাতা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে সেবা নিতে আসা পারুল বেগম নামের এক রোগীর স্বজন বলেন, আমরা এর আগে এখানে একজন বড় ডাক্তার দেখেছি। তিনি মাঝে মাঝে এসে আমাদের সেবা দিতেন। অনেক বছর হয়ে গেল তিনি চলে গেছেন। এরপর আর কাউকে তো দেখি না।
মাহফুজা বেগম নামের এক রোগী বলেন, উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে আসলে শুধু চেকআপের পর কিছু বড়ি ছাড়া আর কোন ওষুধ দেয়া হয়না। এত বড় হাসপাতাল করছে সরকার। শুনেছি নাকি এখানে বড় ডাক্তারের নিয়োগও আছে কিন্তু তাকে তো পাই না। আমরা চাই, এখানে একজন মেডিকেল অফিসার নিয়োগ দেয়া হোক, যিনি নিয়মিত আমাদের সেবা দেবেন।
রায়পুর পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের কর্মকর্তা জিয়াউল কাদের বাবলু বলেন, আমি যোগদান করার গত এক বছরেও মেডিকেল অফিসার ডাঃ আবদুল্লাহ আল নোমানকে (শিশু ডাক্তার) দেখি নাই। আজকে বুধবার এসেই দস্তখত দিয়ে জেলা শহড়ে চলে গেছেন।
তিনি ৫দিন আগে কিছু সময়ের জন্য একবার আসছিলেন। কয়েকবার জেলার মিটিংয়ে তার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট উর্দ্ধতনকর্মকর্তাকে লিখিতভাবে অবহিত করা হলে কোন লাভ নেই।
অভিযোগের বিষয়ে রায়পুরের মেডিকেল অফিসার ডাক্তার আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, আমি সঠিক সময়ে কর্মস্থলে যাই। স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো ভিজিট করি ও রুগীও দেখি। আজ বুধবার কাজ ছিলো, তাই চলে আসছি।
অপরদিকে রামগন্জ উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ডাক্তার এএম সালমান রহমান এবং সদর উপজেলার ডাঃ জুনাইদ আহমেদ মারুফ তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ মিথ্যা দাবি করেন।
লক্ষ্মীপুর জেলা পরিবার পরিকল্পনা কল্পনা কর্মকর্তা ডা. হাসান মাহমুদ তার অধিন্যাস্ত মেডিকেল অফিসারদের অনিয়মের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, জেলায় চিকিৎসক ও কর্মকর্তা খুবই সংকট রয়েছে।
মেডিকেল অফিসারদের কে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো পরিদর্শন ও ওখানেই চিকিৎসেবা দিতে বলা হয়েছে।
বিষয়টি উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করেছি। তারাও আমাকে আশ্বাস দিয়েছেন জেলায় চিকিৎসক নিয়োগ দেয়া হবে। আশা করি, নিয়োগ দেয়া হলে এ সমস্যার সমাধান হবে।
লক্ষ্মীপুর
০১৭১৮০৭৮৪৩৯
০১৮৩৯৮২৯৭৭৩
০৮-০৪-০২৬