
রামেকে আইসিইউ না পেয়ে ৫৩ শিশুর মৃত্যু !
শিবলী সাদিক, রাজশাহীঃ
রাজশাহীর পবা উপজেলার মুরারিপুর এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নূহ আলম।
দুই সপ্তাহ ধরে তার সাড়ে ৮ মাস বয়সী অসুস্থ শিশুসন্তানকে নিয়ে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে আছেন।
নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুটির প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট।
হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা শিশুসন্তানের এমন কষ্ট আর সহ্য হয় না নূহ আলমের। নীরবে চোখের পানি ফেলছেন।
শিশুকে বাঁচাতে চিকিৎসকরা জরুরিভিত্তিতে আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন; কিন্তু আইসিইউতে বেড খালি নেই। সিরিয়াল দিয়ে আইসিইউর সামনে অপেক্ষা করছেন। তার সিরিয়াল নম্বর-২৭। যদি বেড খালি হয়নি এই আশায় দিন কাটে তার আইসিইউর সামনে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আইসিইউ পাওয়া যাবে কিনা নিশ্চিত নন। কারণ আইসিইউতে সাধারণত রোগীদের দীর্ঘ চিকিৎসার প্রয়োজন হয় বলে সহজে বেড খালি হয় না।
ফলে ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে অপেক্ষা করতে হচ্ছে নূহ আলমকে। এভাবে অপেক্ষায় থেকে ৫৩টি শিশু মারা গেছে গত আড়াই মাস।
রামেক হাসপাতারের আইসিইউর ইনচার্জ ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল জানিয়েছেন, ১২ শয্যার শিশু আইসিইউতে কেউ মারা না গেলে সাধারণত খালি হয় না। কোনো শিশু মারা গেলে বেড ফাঁকা হয়। তখন অপেক্ষমাণ থাকা তালিকা ধরে ফোন করা হয়।
তিনি নিশ্চিত করেন, আইসিইউ না পেয়ে গত আড়াই মাসে ৫৩ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে কেবল ১১ থেকে ১৮ মার্চের মধ্যেই আইসিইউতে ভর্তির অপেক্ষায় থাকা ২৮ শিশু মারা গেছে। আর ভর্তির পর মারা গেছে আরও ৯ শিশু।
চিকিৎসকরা বলছেন, নিউমোনিয়ার পাশাপাশি হাম মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। অভিভাবকরা শিশুদের টিকার ডোজ সম্পন্ন করছেন না। একারণে হাম হচ্ছে বেশি। হামে শিশুমৃত্যুর ঘটনাকে উদ্বেগজনকও বলছেন তারা।
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান হাম আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বেড়েছে স্বীকার করে বলেন, ‘আমাদের নিয়মিত টিকা কার্যক্রম চলমান। কিন্তু কী কারণে হাম বাড়ল তা বলা যাচ্ছে না। তবে সারাদেশে শিগগিরই টিকা ক্যাম্পেইন করা হবে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর উদ্যোগ নেবে।’
রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে প্রতিদিনই যেন নেমে আসে অদৃশ্য শোকের ছায়া। কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে করিডর আর অসহায় দৃষ্টিতে সন্তানের নিথর দেহ বুকে জড়িয়ে বসে থাকেন বাবা-মা। গত আড়াই মাসে আইসিইউ সুবিধা না পেয়ে একের পর এক শিশু মারা গেছে।
অন্যদিকে আইসিইউতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলেও শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায়নি আরও ৯টি শিশুকে। সব মিলিয়ে ৬২টি শিশুর প্রাণহানির এই পরিসংখ্যান শুধু একটি হাসপাতালের নয়, এটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার এক গভীর সংকটের যেন প্রতিচ্ছবি।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মৃত শিশুদের বেশির ভাগই ছিল নিউমোনিয়া ও হাম আক্রান্ত। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী এসব রোগের জটিলতা বাড়লে দ্রুত নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন হয়; কিন্তু রামেক হাসপাতালে শিশুদের জন্য আইসিইউ নেই।
তবে স্থানীয়ভাবে সাধারণ আইসিইউর ১২টি বেড শিশুদের জন্য ডেডিকেটেড করা হয়েছে। ফলে বেড খালি না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই সময়মতো চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
শিশু ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি বেডে একাধিক রোগী, কোথাও মেঝেতেও চলছে চিকিৎসা।
অক্সিজেনের জন্য অপেক্ষা। এক বেডে ২/৩ জন করে শিশু রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। রোগীর স্বজনদের ঠাসাঠাসি আর গাদাগাদি অবস্থা। নার্সদের ব্যস্ততা আর স্বজনদের উৎকণ্ঠান সব মিলিয়ে এক চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে ওয়ার্ডজুড়ে।
শিশুর বাবা-মায়েরা অভিযোগ করছেন, সময়মতো আইসিইউ-সুবিধা পেলে হয়তো তাদের সন্তানদের বাঁচানো যেত।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার তরিকুল ইসলাম জানান, তার ৬ মাসে শিশু রিদুয়ান হাম আক্রান্ত ছিল।
হাসপাতালে ভর্তির পর অবস্থা আরও জটিল হয়; কিন্তু অপেক্ষায় থেকে থেকে আইসিইউ পাননি। গত ১৮ মার্চ শিশুটি মারা যায়।
রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার শাহীন হোসেনের ১০ মাস বয়সী শিশু জিহাদ শিশু ওয়ার্ডে (২৪ নম্বর) ভর্তি ছিল। সেও হামে আক্রান্ত। তাকে আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন চিকিৎসক; কিন্তু সিরিয়াল দিয়ে অপেক্ষা করে করে শিশুটির জন্য আইসিইউ পাওয়া যায়নি। অবশেষে ১৮ মার্চ দুপুরে জিহাদ মারা যায়।
শাহীন বলেন, আইসিইউ পেলে হয়তো আমার বাচ্চাটি বেঁচে যেতো।
রাজশাহীর পুঠিয়ার বানেশ্বর থেকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এক শিশুর মা সালেহা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ডাক্তার বলেছিলন আইসিইউ লাগবে; কিন্তু বেড খালি নেই। ঈদ কাটল আইসিইউর সামনে অপেক্ষা করে করে। গোদাগাড়ী থেকে আসা এক শিশুর বাবা জানান, তার বাচ্চা ৩ মাস ধরে অসুস্থ। জ্বর
, কাশি আর হাম। বার বার হাসপাতালে ভর্তি হতে হচ্ছে; কিন্তু কোনো উন্নতি হচ্ছে না।
চিকিৎসকরা বলছেন, বর্তমানে শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া ও হাম রোগের প্রকোপ বেড়েছে।
বিশেষ করে যারা টিকা থেকে বঞ্চিত, তাদের ঝুঁকি বেশি। হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ হলেও টিকাদানে ঘাটতি থাকায় অনেক শিশু আক্রান্ত হচ্ছে এবং জটিল অবস্থায় হাসপাতালে আসছে। তখন তাদের বাঁচাতে প্রয়োজন হয় উন্নত চিকিৎসা সুবিধা, বিশেষ করে আইসিইউ।
হাসপাতালের আইসিইউ ইনচার্জ ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, ‘প্রতিদিন অপেক্ষামাণ সিরিয়াল আপডেট আমি নিজেই করি। গত ১৯ মার্চ সকালে শিশু আইসিইউতে সিরিয়াল ৩৭ নম্বর পর্যন্ত এসেছে। সর্বশেষ সিরিয়ালের রোগীর ঠিকানা রাজবাড়ী জেলায়।
অর্থাৎ সেই ঢাকা বিভাগের রোগীও এখানে চলে এসেছে আইসিইউতে একটি বিছানা পাওয়ার জন্য।
সকালে রাউন্ডের পর একটি বাচ্চার বাবা একটি আইসিইউ বেডের জন্য এমন ভাবে কান্নাকাটি করছিল, খুব খারাপ লাগছিল, অসহায় বোধ করছিলাম।
পাবনা থেকে এসেছেন। এভাবে ঢাকা শহরের কোনো বাচ্চার অভিভাবকদের কান্নাকাটি হলে দেশের দায়িত্বশীলদের মনে হয়তো একটু সহানুভূতি পেতো, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শিশু আইসিইউ তৈরি হয়েও যেতে পারতো।
রাজশাহীর মতো মফস্বল শহরের মানুষের সর্বোচ্চ চিকিৎসা না পাওয়ার হাহাকার কেউ শোনে না।’
জানা গেছে, করোনাকালে রাজশাহীসহ সারাদেশের বিভাগীয় শহরের মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ স্থাপনের জন্য অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছিল; কিন্তু পরে আর যন্ত্রপাতি দেওয়া হয়নি। ফলে আইসিইউ আর হয়নি।
এখনও নতুন অবকঠামো পড়ে আছে। অথচ ঢাকা ও রাজশাহী মেডিক্যালসহ দেশের কোনো সরকারি হাসপাতালেই সরকার অনুমোদিত শিশু আইসিইউ নেই।
প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ২০০ শয্যার রাজশাহী শিশু হাসপাতালটি চালুর অপেক্ষায় পড়ে আছে তিন বছরের বেশি সময়।
ফলে রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের শিশুদের উন্নত চিকিৎসা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।