সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তসহ পরিবারের ৪ সদস্যের সৎকার-দাফন সম্পন্ন

কুষ্টিয়া খুলনা জাতীয় ঝিনাইদহ দুর্ঘটনা সারাদেশ
শেয়ার করুন....,

সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তসহ পরিবারের

৪ সদস্যের সৎকার-দাফন সম্পন্ন

হৃদয় রায়হান, কুষ্টিয়াঃ

কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেল শিখা ইনে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে নিহত কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তের পরিবারের চার সদস্যের সৎকার ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে।

মৃত্যুর ৯২ ঘণ্টা পর গত শনিবার রাতে তাদের লাশ কুষ্টিয়ার নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছানোর পর পরিবারের সদস্য, স্বজন, সহকর্মী সাংবাদিক ও স্থানীয়দের উপস্থিতিতে শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়।

গত শনিবার দিবাগত রাত ১.৩০ মিনিটে সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত ও তার শিশুপুত্র শর্ণশীষ দত্তের লাশ কুষ্টিয়া কেন্দ্রীয় মহাশ্মশানে চিতায় পুড়িয়ে সৎকার করা হয়।

অন্যদিকে দেবাশীষের স্ত্রী আফসানা সিম্মিন ও শ্বশুর আকরাম হোসেনের জানাজা দিবাগত রাত ২.৩০ মিনিটে কুষ্টিয়া শহরের কুঠিপাড়ায় অবস্থিত সদর উপজেলা মডেল মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়।

পরে তাদের কুষ্টিয়া পৌর গোরস্থানে দাফন করা হয়। জানাজায় শত শত মানুষ অংশ নেন।  শনিবার রাত সাড়ে ১০টায় চারজনের লাশ আড়ুয়াপাড়া বাহাদুর আলী বিশ্বাস সড়কের নিজ বাসায় পৌঁছালে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।

একসাথে পরিবারের চার সদস্যের নিথর দেহ দেখে স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। স্বজনদের চিৎকার ও আহাজারিতে উপস্থিত সকলেই অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন। সাংবাদিক দম্পতির একমাত্র কন্যা পাখি বাবা-মা, ছোট ভাই ও নানুর লাশ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে। কয়েক দিন ধরে বাবা-মায়ের ফেরার অপেক্ষায় থাকা শিশুটি জানতো, তারা তার জন্য খেলনা, চকলেট ও জামাকাপড় নিয়ে ফিরবে। কিন্তু তারা ফিরেছেন নিথর দেহে। লাশগুলোর অবস্থা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে স্বজনদের অনেকেই শেষবারের মতো মুখও দেখতে পারেননি।

এসময় মানুষের ভিড়ে অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। শহরের আড়ুয়াপাড়ার ব্যস্ততম মীর মশাররফ হোসেন সড়কে মানুষজনের উপস্থিতিতে সড়কের চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

পরে হাজার হাজার নারী-পুরুষ আড়ুয়াপাড়া তরুণ সংঘ ও পাঠাগার ক্লাবের সামনে মরদেহ শেষবারের মতো দেখেন। গভীর রাতে মহাশ্মশানে সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত ও তার শিশুপুত্রকে ধর্মীয় বিধি মোতাবেক চিতায় পুড়িয়ে সৎকার করা হয়।

এদিকে কুঠিপাড়ায় দেবাশীষের শ্বশুর ও স্ত্রীর লাশ পৌঁছাতে সময় লাগায় সেখানেও গভীর রাত পর্যন্ত স্বজন ও এলাকাবাসী উপস্থিত ছিলেন। স্বজনেরা প্রিয় মানুষদের লাশ পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

সদর উপজেলা মডেল মসজিদ প্রাঙ্গণে পিতা ও কন্যার লাশ ধোয়ানো শেষে সেখানেই জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে পৌর গোরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়।

নিহতদের শেষ বিদায়ে কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন। স্বজনদের সান্ত্বনা দিতে এবং শেষবারের মতো দেখতে বাড়িতে ভিড় করেন স্থানীয়রা।

দেবাশীষের শোকে স্তব্ধ সহকর্মী সাংবাদিকদের চোখেমুখেও ছিল শোক ও কান্নার ছাপ। এর আগে শনিবার সকালে কুষ্টিয়ার একদল সাংবাদিক যশোরের বেনাপোল সীমান্তে সহকর্মীর লাশ গ্রহণ করতে যান। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীরাও সাংবাদিক পরিবারকে শেষবারের মতো দেখতে যান।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হারুন-অর রশিদ নিহতদের পরিবারের হাতে সৎকার ও দাফনের জন্য জনপ্রতি ২৫ হাজার টাকা করে তুলে দেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, দেবাশীষ দত্ত তার স্ত্রী আফসানা সিম্মিন ও শিশুপুত্র শর্ণশীষকে নিয়ে গত ৩ আগস্ট ভারতের বেঙ্গালুরুতে যান।

সেখানে নারায়ণা হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে ১৮ আগস্ট (মঙ্গলবার) বিমানযোগে কলকাতায় পৌঁছে রাত্রিযাপনের জন্য মির্জা গালিব স্ট্রিটের শিখা ইন হোটেলে ওঠেন তারা।

পরদিন ১৯ আগস্ট (বুধবার) তাদের কুষ্টিয়ায় ফেরার কথা ছিলো। কিন্তু ১৮ আগস্ট মধ্যরাতে হোটেলটিতে এসি বিস্ফোরণে সৃষ্ট ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে তারা সকলেই নিহত হন।

নিহত সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত চ্যানেল নাইন ও জাতীয় দৈনিক আজকের কাগজের কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত দৈনিক আজকের আলো পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন।

নিহতদের সাথে থাকা দেবাশীষের শ্বশুর আকরাম হোসেন ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ওজোপাডিকো) কুষ্টিয়া শাখার কর্মচারী ছিলেন। ২০২০ সালে তিনি চাকুরী থেকে অবসর নেন।

তিনি গত ৫ আগস্ট ছোট জামাই ফিরোজের চিকিৎসার জন্য বেঙ্গালুরু যান। ১৬ আগস্ট তিনি মেয়ে-জামাই দেবাশীষের কাছে থেকে যান এবং ছোট জামাই ফিরোজ বাংলাদেশে ফিরে আসেন।

পারিবারিক সূত্রে আরও জানা যায়, প্রায় ৯ বছর আগে পরিবারের মতের বাইরে দেবাশীষ ও সিম্মিনের বিয়ে হয়।

এ নিয়ে সিম্মিনের বাবা আকরাম হোসেন মেয়েকে ফিরে পেতে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছিলেন।  তবে সিম্মিন দেবাশীষকে বিয়ে করার সিদ্ধান্তে অনড় থাকায় আদালতের মাধ্যমে তাকে ফেরাতে পারেননি।

এরপর থেকে তারা নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস ও রীতিনীতি মেনে সংসার করছিলেন। এই মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় কুষ্টিয়ার সাংবাদিক মহল ও স্থানীয়রা গভীর শোকে নিমজ্জিত।


শেয়ার করুন....,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *