বুড়িচংয়ে হাজারো পাখির গ্রাম কিশোরনগর 

অন্যান অর্থনীতি কুমিল্লা চট্টগ্রাম জাতীয় সারাদেশ
শেয়ার করুন....,

বুড়িচংয়ে হাজারো পাখির

গ্রাম কিশোরনগর 

সৌরভ মাহমুদ হারুন, ব্রাহ্মণপাড়াঃ

ভোরের প্রথম আলো ফুটতেই চারদিকে ভেসে আসে হাজারো পাখির কিচিরমিচির। সাদা বকের ঝাঁক আর কালো পানকৌড়ির ডানার ঝাপটায় যেন জেগে ওঠে পুরো গ্রাম। মনে হয়, প্রকৃতি নিজেই এখানে প্রতিদিন নতুন করে জীবনের গান শোনায়।

 

কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার পীরযাত্রাপুর ইউনিয়নের ছোট্ট গ্রাম কিশোরনগর যেন সত্যিই এক জীবন্ত পাখির রাজ্য।

মাত্র তিনটি বাড়ি নিয়ে গড়ে ওঠা ছোট্ট এই গ্রামটির জনসংখ্যা প্রায় এক হাজার। আয়তনে ছোট হলেও সৌন্দর্য আর জীববৈচিত্র্যের দিক থেকে এটি আজ অনন্য। চার বছর ধরে প্রতিবছর বর্ষা এলেই হাজার হাজার সাদা বক, পানকৌড়িসহ নানা প্রজাতির পাখি আশ্রয় নেয় গ্রামের মরহুম  শিক্ষক ও পীরযাত্রাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম মাস্টারের বাড়ির বিশাল গাছগুলোতে।

বাঁশঝাড়, তেঁতুল, আম, নারিকেলসহ নানা গাছে সারি সারি বাসা। শত শত ছানা সেখানে জন্ম নেয়, বড় হয়, তারপর একসময় ডানা মেলে উড়ে যায় দূর আকাশে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বুড়িচং উপজেলা সদর থেকে এরশাদ ডিগ্রি কলেজের দক্ষিণ পাশের সড়ক ধরে প্রায় দুই কিলোমিটার পশ্চিমে গেলেই কিশোরনগর। একসময় অনেকেই গ্রামের নাম জানতেন না। এখন ‘পাখির গ্রাম’ বললেই সবাই চিনে নেয় কিশোরনগরকে।

গ্রামের চারদিকে বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত। বর্ষায় সাত-আট কিলোমিটার এলাকা পানিতে ডুবে গেলে বিল, পুকুর আর জলাভূমিতে তৈরি হয় পাখিদের জন্য অফুরন্ত খাদ্যের ভাণ্ডার। নিরাপদ আশ্রয় আর পর্যাপ্ত খাবারের টানে প্রতি বছর তারা ফিরে আসে এই গ্রামে।

বিকেলের দিকে কিশোরনগরের রূপ যেন আরও মোহনীয় হয়ে ওঠে। জলাশয়ের মাঝ দিয়ে নির্মিত পাকা সড়কের দুই পাশে সারি সারি সুপারি গাছ। সেই পথে হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ে গাছভর্তি সাদা বক আর পানকৌড়ির দল।

চারপাশে দর্শনার্থীদের ভিড়, ছোট ছোট দোকানে ঝালমুড়ি, ফুচকা, চানাচুর, চা-কফির আড্ডা। প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিনই আশপাশের গোপীনাথপুর, গোসাইপুর, কণ্ঠনগর, শিবরামপুর, রামপুর, পারুয়ারাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ছুটে আসেন।

স্থানীয় বাসিন্দা নাজমুল হাসান, জামাল উদ্দিন ও রফিকুল ইসলাম জানান, শুরুতে এত পাখি ছিল না। গত কয়েক বছরে পাখির সংখ্যা অনেক বেড়েছে। গ্রামের মানুষ নিজের সন্তানের মতোই পাখিগুলোকে আগলে রাখেন। কেউ ছানা ধরতে বা বিরক্ত করতে এলে সবাই মিলে বাধা দেন।

গ্রামের বাসিন্দা অ্যাডভোকেট মজিবুর রহমান ব্ল্যাক বলেন, “পাখিগুলো এখন আমাদের পরিবারেরই সদস্য। শিশু থেকে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা—সবাই প্রতিদিন প্রকৃতির এই অপূর্ব দৃশ্য উপভোগ করে। সন্ধ্যার পর রাতের নীরবতায় পাখিদের ডাক শুনলে মনে হয়, প্রকৃতি যেন আমাদের সঙ্গে কথা বলছে। তাই তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।”

কুমিল্লা সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, “পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পাখির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিশোরনগরের পাখির অভয়াশ্রমের বিষয়টি জেনেছি। খুব শিগগিরই এলাকা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

মানুষের ভালোবাসা, প্রকৃতির উদারতা আর পাখিদের নির্ভরতার এক অনন্য মিলনস্থল কিশোরনগর। যথাযথ সংরক্ষণ করা গেলে ‘পাখির গ্রাম’ কিশোরনগর শুধু কুমিল্লার নয়, সমগ্র বাংলাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য প্রকৃতি-পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করতে পারে।


শেয়ার করুন....,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *